এআই কীভাবে সত্যিই ‘সব মানুষকে মেরে ফেলতে’ পারে? সবচেয়ে সম্ভাব্য পাঁচটি পরিস্থিতি

২২ সেপ্টেম্বর লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে গবেষক ও শিক্ষাবিদদের লেখা প্রকাশকারী আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কনভারসেশন’–এ। লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক টবি ওয়ালশ। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা সিএসআইআরওর ডেটা৬১-এর গবেষক টবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করেন। পাশাপাশি এ বিষয়ে লেখালেখি করে পেয়েছেন সেলেস্টিনো ইউরেকা পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা। তাঁর ‘গড এআই: বুম অর ডুম? হোয়াট টু এক্সপেক্ট হোয়েন মেশিনস আউটস্মার্ট আস’ বইটি এখন বেশ আলোচিত। ‘দ্য কনভারসেশন’–এ প্রকাশিত তাঁর লেখাটির ভাবানুবাদ পড়ুন

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক টবি ওয়ালশ
ছবি: টব ওয়ালশ ডটএআই

চলতি মাসের (সেপ্টেম্বর ২০২৬) শুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক জ্যাকব কক্সন মাত্র চার মাস কাজ করার পর অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগ করেন। এক্সে দেওয়া এক ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘এআইয়ের কারিগরেরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, এই দশকের শেষ নাগাদ এআই আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে।’

অ্যানথ্রপিকের জ্যেষ্ঠ কর্মী ইভান হুবিঙ্গারও কক্সনের সঙ্গে একমত। তাঁর ধারণা, আগামী এক দশকের মধ্যে এমনটা ঘটার আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি।

স্বাভাবিকভাবেই এসব বক্তব্য সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এআই গবেষণার গতি কমানো এবং প্রযুক্তিটির ওপর ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণ’ বাড়ানো নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই ঠিক কীভাবে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে?

এ নিয়ে কল্পনাপ্রসূত পরিস্থিতির অভাব নেই। আর এর বেশির ভাগের কেন্দ্রে আছে ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ এআইয়ের ধারণা। অর্থাৎ এমন এআই, যা মানুষের চেয়েও বেশি ‘শক্তিশালী’।

আমি এসব আশঙ্কাকে মোটামুটি সবচেয়ে অস্পষ্ট থেকে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট, এই ক্রমে পাঁচটি পরিস্থিতিতে নামিয়ে এনেছি। আমার মতে, আশঙ্কার দিক থেকেও তালিকাটি কম থেকে বেশি, এই ক্রমেই সাজানো যায়।

আরও পড়ুন

১. আমরা কখনোই জানতে পারব না

একটি সুপারইন্টেলিজেন্স কী করতে সক্ষম, তা অনুমান করতে হলে তো আমাদেরও সুপারইন্টেলিজেন্ট হতে হবে
ছবি: এআই/ম্যাগনিফিক

এআই নিয়ে ‘ডুম’ বা মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা করা ব্যক্তিরা প্রায়ই একটি বিরক্তিকর ক্যাচ-২২ (পরস্পরবিরোধী শর্তের ফাঁদ) ধরনের যুক্তি দেন। তাঁরা বলেন, একটি সুপারইন্টেলিজেন্স আমাদের মতো অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমান প্রাণীদের ধ্বংস করতে কী করতে পারে, তা আমরা কীভাবে আগেভাগে কল্পনা করব?

একটি সুপারইন্টেলিজেন্স কী করতে সক্ষম, তা অনুমান করতে হলে তো আমাদেরও সুপারইন্টেলিজেন্ট হতে হবে। বিষয়টা অনেকটা আপনার পোষা কুকুরকে দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের কথা কল্পনা করতে বলার মতো।

এখানে অবশ্য একটা সুখবর আছে। সুপারইন্টেলিজেন্স এখনো হয়তো আমাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে। বর্তমান এআই মডেলগুলো নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা সমাধানে দুর্দান্ত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা সব ধরনের কাজে একজন মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।

তবে সম্প্রতি এআই সবচেয়ে কঠিন বলে বিবেচিত সাতটি গণিত সমস্যার একটির সমাধান করেছে। অন্য কয়েকটিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বলে শুনছি। ফলে এ বিষয়ে আশাবাদী থাকা হয়তো আগের চেয়ে একটু কঠিন।

২. পেপারক্লিপ

একটি সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সম্ভবত অসাধারণ দক্ষ হবে। কিন্তু মানুষের টিকে থাকা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা না–ও থাকতে পারে।

এ ধরনের উদাসীনতার ধ্রুপদি উদাহরণ দিয়েছেন অক্সফোর্ডের দার্শনিক নিক বোস্ট্রম। তাঁর কল্পিত পরিস্থিতিতে একটি সুপারইন্টেলিজেন্ট এআইকে যত বেশি সম্ভব পেপারক্লিপ তৈরি করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে এআইটি খুব দ্রুত পৃথিবীর সবকিছুকে (মানুষ, গ্রহ, এমনকি নক্ষত্রকেও) পেপারক্লিপ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করবে।

এখানে সমস্যাটা হলো, ভুলভাবে ঠিক করে দেওয়া একটি লক্ষ্যও এআই নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করবে। এআই মানবজাতিকে ঘৃণা করে না। তার কাছে আমরা কেবল এমন কিছু পরমাণুর সমষ্টি, যেগুলো পেপারক্লিপ তৈরিতে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়। ব্যাপারটা ব্যক্তিগত নয়।

তবে এখানেও একটা সুখবর আছে। এ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ক্ষমতাকে এক করে ফেলা হচ্ছে। একটি সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই কোনো লক্ষ্য অর্জনে অসাধারণ দক্ষ হলেই যে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষমতাও তার থাকবে, এমন নয়।

পৃথিবীকে পেপারক্লিপ তৈরির কারখানায় পরিণত করতে হলে প্রথমে নির্মাণের অনুমতি নিতে হবে। আর অনুমতি পেলেও এত বেশি পেপারক্লিপ কারখানা তৈরির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হবে। বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী আদালতে গিয়ে প্রকল্প আটকে দিতে পারে। পরিবেশবাদীরা বুলডোজারের সামনে দাঁড়াতে পারেন।

পৃথিবীতে এমন অনেক বাধা ও জটিলতা আছে, যা অত্যন্ত বুদ্ধিমান কাউকেও নিজের ইচ্ছা সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া রুখে দেয়। তবে বাস্তবে ডেটাসেন্টারগুলোকে এই তাত্ত্বিক ‘পেপারক্লিপ’ পরিস্থিতির বর্তমান সংস্করণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আর পৃথিবীকে আরও বেশি ডেটাসেন্টারের জন্য ছেড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে মানুষও ক্রমে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।

৩. জৈব অস্ত্র

সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই যদি কোনো ভয়ংকর নতুন জৈব অস্ত্র তৈরি করে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়, তাহলে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

এটি এআই ফিউচার্স প্রজেক্টের তৈরি ‘এআই ২০২৭’ পরিস্থিতির একটি সম্ভাব্য পরিণতি। এআই ফিউচার্স প্রজেক্ট একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যারা উন্নত এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পূর্বাভাস দেয়।

গত মাসে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জেনেটিক ভাষা মডেল ব্যবহার করে ১৬টি নতুন ভাইরাস সংশ্লেষণ করার ঘোষণা দেওয়ার পর এই ঝুঁকি আরও বাস্তব বলে মনে হয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, গবেষকেরা নিজেরা ভাইরাস তৈরি করেননি। তাঁরা শুধু ভাইরাসগুলোর জেনেটিক সিকোয়েন্স একটি বাণিজ্যিক পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠান ওই জেনেটিক তথ্য ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে ভাইরাসের নমুনা তৈরি করে গবেষকদের কাছে পাঠায়। পুরো প্রক্রিয়ায় খরচ হয়েছিল সর্বোচ্চ কয়েক লাখ ডলার।

তবে এখানেও একটা সুখবর আছে। নতুন কোনো ভাইরাস দিয়ে পৃথিবীর সবাইকে মেরে ফেলা আশ্চর্য রকম কঠিন।

সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই যদি কোনো ভয়ংকর নতুন জৈব অস্ত্র তৈরি করে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়, তাহলে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে
ছবি: এআই/ম্যাগনিফিক

এ জন্য এমন একটি ভাইরাস দরকার, যা একই সঙ্গে খুব সহজে ছড়াতে পারে এবং অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু জীববিজ্ঞানের একটি নিয়ম হলো, যেসব ভাইরাস সহজে ছড়ায় সেগুলো সাধারণত তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী।

অন্যদিকে কোনো ভাইরাস যদি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়, তাহলে তার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা সাধারণত কমে যায়। কারণ, আক্রান্ত মানুষ ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সময় পাওয়ার আগেই প্রাণ হারায়।

কোভিডে মানবজাতির ১ শতাংশেরও কম মানুষ মারা গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারি ছিল ব্ল্যাক ডেথ। চতুর্দশ শতাব্দীতে এই প্লেগ ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

তবে আজকের দিনে আমাদের উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও স্যানিটেশনের কারণে প্লেগও অনেক কম প্রাণঘাতী হতে পারে।

আরও পড়ুন

৪. পারমাণবিক যুদ্ধ

এআই যদি পারমাণবিক অস্ত্রের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে এবং পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করে দেয়, তাহলে কী হবে?

গত ৫০ বছরে আমরা ভুলবশত বেশ কয়েকবার পারমাণবিক যুদ্ধের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম।

আমাদের বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্রের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ২০১০ সালে আমরা দেখেছি, স্টাক্সনেট নামের একটি কম্পিউটার ওয়ার্ম (নিজে নিজেই এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন ক্ষতিকর সফটওয়্যার) ইরানের পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজগুলো অচল করে দিয়েছিল। ধারণা করা হয়, ইউএসবি স্টিকের মাধ্যমে এটি সেখানে ঢোকানো হয়েছিল।

এআই সামরিক বাহিনীকে ভুল গোয়েন্দা তথ্যও দিতে পারে। আর সেখান থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, যার পরিণতি ঠেকানো অসম্ভব।

এখানেও অবশ্য একটা সুখবর আছে। বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত কমেছে। তবে সেসব এখনো সম্ভবত পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

আর মানুষ মারা যাবে শুধু পারমাণবিক বিস্ফোরণে নয়। এরপরের ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ (বিস্ফোরণের পর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও ধুলায় পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরিস্থিতি) যে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনবে, সেটিই হতে পারে আরও বড় ঘাতক।

৫. অন্য মানুষ

ধীরে ধীরে আমরা হয়তো এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাব, যখন বড় পরিসরে মানুষের জীবন টিকিয়ে রাখার মতো সামাজিক সক্ষমতাই আর অবশিষ্ট থাকবে না
ছবি: এআই/ম্যাগনিফিক

সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, শেষ পর্যন্ত আমরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলব। আর এআই সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন, এতে খুব বেশি কল্পনাশক্তিরও দরকার নেই। এআই ব্যাপক হারে মানুষের চাকরি কেড়ে নিল, ভুল তথ্য দিয়ে তথ্যের জগৎকে দূষিত করল, আমাদের রাজনীতিকে আরও বিভক্ত করে দিল এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি সঙ্গীর মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিল।

সমাজ খুব সহজেই ভেঙে পড়তে পারে। ধীরে ধীরে আমরা হয়তো এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাব, যখন বড় পরিসরে মানুষের জীবন টিকিয়ে রাখার মতো সামাজিক সক্ষমতাই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

তাহলে এসব পরিস্থিতি থেকে আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত? নিশ্চিতভাবেই কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। তবে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই, এটাই আমার আশা।

আরও পড়ুন