আমরা কেউ কাউকে ‘তুমি’ বলিনি

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।

ছবি: এআই/প্রথম আলো

সে আমার ক্লাসের কেউ ছিল না। আমাদের পরিচয় বলতে যা ছিল, তাকে আসলে পরিচয় বলা যায় না, শুধু দেখা। বছরে দু–একবার কালচারাল প্রোগ্রামে দেখা হতো। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে ডিবেট বা কবিতা পড়ত আর আমি ভিড়ের মধ্যে এক পাশে নীরবে বসে দেখতাম। চোখে চোখ পড়লে দৃষ্টি সরিয়ে নিতাম, আর তখনই বুঝতাম, সে তাকিয়েই আছে। সেই দৃষ্টির ভেতর কোনো কথা ছিল না, তবু একধরনের নীরব টান ছিল।

রাস্তায়ও মাঝেমধ্যে দেখা হতো। বান্ধবীর হাত ধরে হাঁটছি, হঠাৎ সামনে সে। কারও মুখে কথা নেই, শুধু একমুহূর্তের চোখাচোখি, তারপর দুজনেই নিজের পথে। এই ক্ষণিক দেখা যেন দিনের ভেতর লুকানো কোনো গোপন আনন্দ।

সবচেয়ে বেশি দেখা হতো মাঠের ধারে। বিকেলে সে ফুটবল খেলত, আর আমি রাস্তা দিয়ে যেতাম। মাঠের দিকে না তাকানোর ভান করলেও চোখের কোণ দিয়ে দেখতাম, সে খেলা থামিয়ে আমাকে দেখছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি উঠত। ভালোবাসা ছিল কি না জানি না, কিন্তু অপেক্ষা ছিল। প্রতিদিন সেই পথ দিয়ে যাওয়ার অকারণ একটা আনন্দ ছিল, যেন না বলেও কিছু বলা হয়ে যায়।

আমাদের মধ্যে কোনো দিন কথা হয়নি। না কোনো চিঠি, না কোনো বার্তা বিনিময়, না কোনো প্রতিশ্রুতি। তবু সম্পর্কটা কোথাও ছিল, নীরব, অদৃশ্য।

তারপর সময় আমাদের আলাদা করে দিল। আমি সংসারে ঢুকে গেলাম, সে নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সন্তান, দায়িত্ব, সামাজিক অবস্থান—সব মিলিয়ে সেই নীরব গল্পটা চাপা পড়ে গেল।

ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি। কিন্তু ভুলিনি।

২৯ বছর পর একদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় তার নামটা ভেসে উঠল। বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। ছবিতে বয়সের ছাপ, তবু চোখ দুটো আগের মতোই।

অনেকক্ষণ ভেবে লিখলাম, ‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারেন?’

ওপাশ থেকে উত্তর এল, ‘চিনতে না পারার প্রশ্নই নেই।’

সেই এক লাইনে জমে থাকা সব স্মৃতি ফিরে এল।

আমরা দেখা করলাম। খুব সাধারণ একটা জায়গায়। পাশাপাশি হাঁটলাম, কথা বললাম পরিবার, সন্তান, জীবন নিয়ে।

হঠাৎ সে বলল, ‘আপনাকে মাঠের পাশ দিয়ে যেতে দেখলেই খেলাটা থেমে যেত।’

হেসে বললাম, ‘জানতাম।’

সেই হাসির ভেতর আনন্দের চেয়ে স্বীকৃতি ছিল বেশি, আমরা দুজনেই জানতাম, তখনো–এখনো।

আমরা আর এগোইনি। এগোনোর মানে ছিল অনেকগুলো সম্পর্ক ভাঙা। তাই থেমে গেলাম, পরিণত মানুষের মতো। আমাদের কথাবার্তায় এখনো ‘আপনি’ শব্দটাই রয়ে গেছে। কেউ কাউকে ‘তুমি’ বলিনি। ‘তুমি’ সম্বোধনটা খুব কাছের, খুব আপন—যেন দূরত্বের শেষ সীমানাটুকুও মুছে দেয়। আমরা সেই সীমানাটা ইচ্ছা করেই রেখে দিয়েছি।

এখন মাঝেমধ্যে শুধু ‘হাই’ হয়, ‘ভালো আছেন?’—এর বেশি কিছু নয়। তবু বিকেলের আলোয় মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, কোথাও কেউ হয়তো আবার খেলা থামিয়ে তাকিয়ে আছে, আর আমি আগের মতোই না দেখার ভান করছি।

আরও পড়ুন