শিশু নিখোঁজ হলে সবার আগে যা করবেন
৩ সেপ্টেম্বর বিকেলের ঘটনা। আমার বাসার সহকারীর আসল নাম এখানে উল্লেখ করছি না। ধরা যাক, তাঁর নাম রাবু আপা। তিনি আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়ের দেখাশোনাও করেন, তাঁকে নিচে পাঠালাম একটা জিনিস কিনতে। মেয়ে জেদ ধরল, সে-ও যাবে। তার উদ্দেশ্য গিয়ে ‘আন্টিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে’ চিপস বা চকলেট কেনা। বাসার নিচেই মুদিদোকান। বললাম, ‘আচ্ছা যাও।’
২০–২৫ মিনিট পর ফিরে এসে রাবু আপা যা বললেন, শুনে আমি ভয়ে কাঠ। তিনি বললেন, ‘আপা, আমি বাবুকে পাশে রেখে বাজারসদাই বুঝে নিতেছি; হঠাৎ খেয়াল হইল বাবু নাই। আশপাশে খোঁজ করতেই দেখি, গলির মাথার দিকে এক মহিলা বাবুর হাত ধইরা তড়িঘড়ি কইরা হাঁইটা যাইতাছে। আমি দৌড়ায় গেলাম মহিলার কাছে। জিগাইলাম, এই বাচ্চা কেন নিতেছ? সে উল্টা আমারে জিগায়, “তোমার বাচ্চা?” তখন তাড়াতাড়ি বাবুরে নিয়ে চলে আসলাম।’
তাৎক্ষণিকভাবে রাবু আপাকে নিয়ে নিচে নামলাম ওই নারীর খোঁজে, কিন্তু খুঁজে পেলাম মা। এই রাস্তায় সিসি ক্যামেরা না থাকায় ওই নারীকে খুঁজে বের করার আর কোনো উপায় ছিল না।
আমার মেয়ে যে রাবু আপার পাশে নেই, এটা বুঝতে তাঁর আরেকটু দেরি হলেই কী যে হতো, জানি না! এরপর কখনো আমার মেয়েকে ওর বাবা ছাড়া আর কারও সঙ্গে বাইরে পাঠানোর সাহস করতে পারব কি না, জানি না।
তবে এই ঘটনার পর শিশু নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। তাতে যেসব বিষয় জানলাম, তা আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি।
শিশু হারিয়ে গেলে প্রথম এক ঘণ্টায় কী করবেন
সন্তান নিখোঁজ হয়েছে বোঝার পর সবচেয়ে জরুরি হলো ওই চরম সংকটময় সময়েও যথাসম্ভব শান্ত থাকা। কেননা, শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। তাই প্রথম ঘণ্টার প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সেই সময়ের মধ্যে আপনার সন্তান ওই এলাকায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আতঙ্কিত হয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. দ্রুত আশপাশে খুঁজুন
শিশুকে সর্বশেষ কোথায়, কখন এবং কার সঙ্গে দেখা গেছে, তা নিশ্চিত করুন। বাড়ি, সিঁড়ি, ছাদ, গলি, দোকান, খেলার জায়গা, স্কুল, পার্ক, বাসস্ট্যান্ডসহ আশপাশের সম্ভাব্য স্থানগুলোয় দ্রুত খোঁজ করুন। একা না গিয়ে পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের জায়গায় জায়গায় ভাগ করে দিন।
২. সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানান
শিশু নিজে থেকেই ফিরে আসবে, এমন আশায় অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন। নিখোঁজ হওয়ার পর যত দ্রুত পুলিশকে জানানো যায়, তত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করার সুযোগ বাড়ে। আর সেই সঙ্গে বাড়ে সন্তানকে দ্রুত ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও। এ ক্ষেত্রে আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ হতে পারে সবচেয়ে সহায়ক।
৩. প্রয়োজনীয় সাধারণ তথ্য
শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, নাম, বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, পরনের পোশাক ও জুতার বিবরণ, কোনো বিশেষ শারীরিক চিহ্ন এবং সর্বশেষ কোথায় ও কখন দেখা গেছে—এসব তথ্য পুলিশকে দিন। নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ বা জিডিও করুন। শিশুর কাছে মুঠোফোন থাকলে ফোন করুন। ফোনের শেষ অবস্থান, কল, মেসেজ বা অন্য কোনো ডিজিটাল তথ্য থাকলে তা মুছে ফেলবেন না।
৪. ছবি প্রচার করুন, তবে সতর্কভাবে
সাম্প্রতিক পরিষ্কার ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে স্থানীয় ও বিশ্বস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে শিশুর নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে জন্মনিবন্ধন নম্বর, পূর্ণ ঠিকানার মতো অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। শিশুটি যে এলাকার ও শিশুকে সর্বশেষ যে এলাকায় দেখা গেছে, সেই এলাকার সংশ্লিষ্ট ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বিষয়টি শেয়ার করুন।
৫. হাসপাতাল ও পরিবহনকেন্দ্রে খোঁজ নিন
রাস্তার মোড়, গলির মাথা মূল সড়কের যেখানে গিয়ে মিশেছে, নিকটবর্তী হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটেও খোঁজ করুন।
মুন অ্যালার্ট
গত জানুয়ারি মাসে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) নামের বিশেষ সেবা চালু করেছে। ২০২৪ সালে সিলেটে অপহরণের পর নিহত শিশু মুনতাহার স্মরণে এই অ্যালার্ট সিস্টেমের নামকরণ করা হয়েছে।
দেশজুড়ে কোনো শিশু নিখোঁজ হলে সিআইডির টোল ফ্রি হটলাইন নম্বর ১৩২১৯-এ কল করে জানানো যাবে। এ ছাড়া ‘মুন অ্যালার্ট’ (munalert.org) ওয়েবসাইটেও নিখোঁজ শিশুর তথ্য রিপোর্ট করা যায়। সিআইডি জানিয়েছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরবর্তী তিন ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন টাইম’ বিবেচনা করে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। এর পাশাপাশি দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও তথ্য দেওয়া যাবে।
জানুয়ারিতে সিআইডি জানিয়েছিল, এই জরুরি সতর্কবার্তা অফিশিয়াল ওয়েব পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, ব্যাংকের এটিএম বুথ, প্রয়োজন অনুযায়ী মুঠোফোনে খুদে বার্তা ও অন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচার করা হবে, যাতে সাধারণ জনগণ দ্রুত তথ্য দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়ায় শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান এখনো মেলেনি।
পুলিশ জানায়, ওই সময়ে নিখোঁজ ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশের সন্ধান এখনো মেলেনি।
তবে পুলিশ বলছে, নিখোঁজ মানেই অপহৃত বা পাচারের শিকার, এমন নয়। আর পুলিশ যে হিসাব দিয়েছে, সেটি মূলত নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে বাইরে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা বা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও এর মধ্যে আছে।
জনগণের বিভ্রান্তি দূর করতে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে, নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর আছে। অবশিষ্ট শিশুদের খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
সূত্র: প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও মুন অ্যালার্ট