প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন তানভীর শহীদ। তিনি বিশ্বাস করেন, যেকোনো পরিবর্তন আনতে হলে সবার আগে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আওয়াজ পৌঁছানো জরুরি। আর আওয়াজ পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিক্ষা। তাই নিজের জায়গা থেকে সব সময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে চেষ্টা করেন তিনি। বলেন, ‘শিক্ষাকে পুঁজি করে আজ আমি এখানে। বাংলাদেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিতে পারে। এতে তাঁরা নিজের ও দেশের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।’

অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক একটি সংস্থা আছে। নাম ‘ন্যাশনাল অফিস অব ওভারসিজ স্কিলস রিকগনিশন’ সংক্ষেপে এনওওএসআর। এই সংস্থা বিভিন্ন দেশের শিক্ষার মান, দক্ষতা, এসব বিষয়ে একটি প্রোফাইল তৈরি করে। এক দশক আগেও এনওওএসআরের কাছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য ছিল না। এ কারণে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের সনদের মান ছিল কম। ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে উদ্যোগী হন তানভীর শহীদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য, আঞ্চলিক পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণের বন্দোবস্ত করেন। কেননা, তিনি জানতেন, একবার ঘুরে গেলে বাংলাদেশ বিষয়ে ম্যাককুয়ারি কর্তৃপক্ষের ধারণা বদলে যাবে। হলোও তা-ই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষত বাংলাদেশিদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন তাঁরা। বাংলাদেশ ঘুরেফিরে যাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তানভীরকে বাংলাদেশ নিয়ে একটি ব্যক্তিগত প্রতিবেদন তৈরি করতে বলেন।

দায়িত্বের অংশ না হওয়ার পরও বেশ পরিশ্রম করে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি। সেই শ্রম বৃথা যায়নি। ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পায় প্রতিবেদনটি। ফলে সরকারি নথিতে হালনাগাদ না হলেও ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শিক্ষা সনদের মান বৃদ্ধি করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা দিতে শুরু করে। এর পরপরই ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিষয়টি দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরে আসে। তানভীর শহীদের তৈরি প্রতিবেদনটি আমলে নেয় অন্যরাও। ফলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরেকটি পদ্ধতিও তানভীর শহীদের নজর কাড়ে। তিনি খেয়াল করেন, বিশেষ করে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ছয় মাসের জন্য স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ায় এক সেমিস্টারের জন্য পড়তে আসেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মাঝামাঝি সময়ে এক সেমিস্টার অস্ট্রেলিয়ায় পড়েন আবার ফেরত চলে যান। এতে প্রায় একই খরচে দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধা পান তাঁরা। কিন্তু এই সুবিধা কেবল তালিকাভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীরাই ভোগ করতে পারেন।

তানভীর শহীদ ভাবতে থাকেন, কীভাবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে পারেন। বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান র‍্যাঙ্কিংয়ে খুব উল্লেখযোগ্য না হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ায় ক্রেডিট ট্রান্সফার বেশ দুঃসাধ্য ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই স্বল্পমেয়াদি শিক্ষার্থী ভিসাও দেওয়া হতো না। তবে তানভীর আশা ছাড়েননি। অস্ট্রেলিয়ায় স্নাতকোত্তর বা গবেষণায় যুক্ত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কিংবা অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি। তাঁর এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র প্রকল্প গ্রহণে রাজি হয় ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তানভীর বলেন, এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। যেহেতু সেমিস্টার ফি দেওয়া হয়ে যায় এবং এক বছরের কম সময় থাকতে হয়, তাই শিক্ষার্থী ভিসা পেতে আবশ্যিক শর্ত হিসেবে বিশাল অঙ্কের টাকা দেখাতে হয় না। পাশাপাশি এই সময় স্বল্পমেয়াদি কাজ করে অর্থও উপার্জন করা যায়। শিক্ষার্থীদের ভাষা দক্ষতা বাড়ে, নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা ফিরে যেতে পারেন।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য তানভীরের পরামর্শ, ‘আগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করুন। গবেষণা বা পিএইচডি করতে তেমন কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এই ব্যয় বহন করে। তাই ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হবে।’