ইতিহাসে ভেগান 

নিরামিষ ভোজন বা ভেজিটেরিয়ানচর্চা অনেক পুরোনো। বলা হয়, প্রাচীন ভারতীয় ও সিন্ধু সভ্যতা মূলত নিরামিষাশী ছিল। সম্রাট অশোক, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নিরামিষাশী ছিলেন। একইভাবে নিরামিষভোজী ছিলেন গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাস, থিওফ্রাস্টাস, প্লুটার্ক প্রমুখ, এমনকি প্রাচীন রোমান কবি ওভিড বা প্রাচীন আরব কবি আল-মারি। ১৮৪৩ সালে লন্ডনে ভেজিটেরিয়ান সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ঘোষণা করা হয়, ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষাশীরা মূলত দুই ধরনের হতে পারেন। প্রথম ধরনটি কোনো ধরনের অ্যানিমেল প্রোডাক্ট বা প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের বিপক্ষে। আরেকটি ধরন প্রাণীর ক্ষতি করে না, এমন আমিষ যেমন দুধ, ডিম, দই, পনির গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কালে কালে প্রথম ধরনটিই ভেগান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধী এই ভেজিটেরিয়ান সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় বক্তব্য প্রদানকালে বলেছিলেন যে নিরামিষ গ্রহণ কেবল সুস্থতা বা সুস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি নৈতিকতারও বিষয়। মানুষ হিসেবে আমাদের এই নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ভেজিটেরিয়ানদের থেকে আলাদা হয়ে ভেগান সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় এরও পরে—১৯৪৪ সালে। এই মতবাদের শর্তগুলো নিয়ে ভেগান সোসাইটির পক্ষে একটি সংবাদবাহী পত্র প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠাতা ডোনাল্ড ওয়াটসন। সে সময় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই এই আহ্বানে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন আইরিশ নাট্যকার, সমালোচক, রাজনৈতিক কর্মী জর্জ বার্নার্ড শ বা রাশিয়ান-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার বারবারা মুর মতো মানুষও। ভেগান সোসাইটির মতে, ভেগানিজম কেবল খাদ্যাভ্যাস নয়, এটি একধরনের জীবনদর্শন। এই দর্শনে প্রাণিজগতের ওপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন বা নিষ্ঠুরতাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়, সেটা খাবার, পোশাক বা অন্য যেকোনো পণ্য ব্যবহারের জন্যই হোক। ভেগানিজম দুনিয়াজুড়ে প্রাণিজ পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের বিপক্ষে এবং এর বিকল্প উৎস সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছে।

চেতনায়–সচেতনতায় 

২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ভেগানিজমের পক্ষে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হতে শুরু করে। সুপারমার্কেটগুলো ভেগান পণ্যর জন্য আলাদা জায়গা খোলে, দেশে দেশে চালু হয় ভেগান চেইন রেস্তোরাঁ। দ্য ইকোনমিস্ট ২০১৯ সালকে ভেগান বর্ষ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোয় চালু হয় ভেগান মিল বা ভেগান লাঞ্চ। সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হতে দেখা যায় চীন ও হংকংয়ের জেনারেশন ওয়াই-কে। বিশিষ্ট ভেগানকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এ বিষয়ে একটি বড় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশেও একটি প্রজন্ম আজকাল ভেগানচর্চায় উৎসাহিত হয়ে উঠছে। যত দিন যাচ্ছে তত নিরামিষ ভোজন, প্রাণী সুরক্ষা, পরিবেশবাদের পক্ষে মতাদর্শ জোরালো হচ্ছে। বিখ্যাত মিউজিশিয়ান ব্রায়ান অ্যাডামস, মার্কিন গায়ক–গীতিকার স্টিভি ওয়ান্ডার, হলিউড তারকা ওয়াকিন ফিনিক্স বা উডি হেরেলসন, পামেলা অ্যান্ডারসন, নাটালি পোর্টম্যান, স্পাইডারম্যানখ্যাত টবি ম্যাগুয়ের, ফর্মুলা ওয়ানবিজয়ী ব্রিটিশ রেসিং ড্রাইডার লুইস হ্যামিলটনসহ আরও অনেক তারকাই এখন ভেগান মতবাদে বিশ্বাসী ও এর প্রচারক।

বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে  

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ইদানীং বাড়ছে ভেগানিজমের চর্চা। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন এ বিষয়ে। আরিশা তাহনি কয়েক বছর আগে থাইল্যান্ডে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রথম ভেগানিজমে উদ্বুদ্ধ হন। সেখানে তাঁর প্রজন্মের অনেককেই তিনি পরিবেশসচেতনতা সৃষ্টিতে সক্রিয় হতে দেখেন। পরিবেশবাদের সঙ্গে ভেগানিজমের সম্পর্ক নিবিড়। কারণ, যত মাংস বা মাংসের তৈরি খাদ্য উপাদান কম গ্রহণ করা হয়, তত পরিবেশদূষণ কমে। পরে এ বিষয়ে আরও পড়াশোনা করে আরিশা ভেগানিজমে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে ভেগানিজম চর্চার সমস্যা কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে নিরামিষভোজ বা ভেগানিজম কোনোটারই সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তাই বাইরে খেতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। রেস্তোরাঁগুলোয় ভেগান বা ভেজিটেরিয়ান খাবারের অপশন খুবই কম। রেস্তোরাঁয় যদিবা মেলে, আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হয় নিমন্ত্রণে, উৎসবে গেলে। কারণ, সেখানে নিরামিষভোজীদের জন্য খাবার থাকেই না বলতে গেলে। তার ওপর যদি কেউ নিজের মতো করে কেবল সবজি বা ডাল নিতে চায়, তবে সবাই চোখ কপালে তোলে। কেন খাবে না, কী সমস্যা, ডায়েট করছ নাকি, অ্যালার্জি ইত্যাদি প্রশ্ন উঠে আসে। কেউ যে আমিষ প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তা মানতে রাজি নন অনেকেই। আরিশা মনে করেন, সব ধরনের মানুষের জন্য খাবারে বৈচিত্র্য রেখে অতিথি আপ্যায়ন বা মেন্যু ঠিক করা ভালো।

পুষ্টি পাওয়া যাবে কি?

ভেগান ডায়েটে খাবারগুলো মূলত উদ্ভিদ থেকে গ্রহণ করা হয়। তাতে কি ভিটামিন, খনিজ বা আমিষের অভাব দেখা দিতে পারে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নুরুনাহার দিলরুবা জানান, ভেগান খাদ্যতালিকা তৈরি করার সময় কিছু কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (যেমন ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-২, জিংক, আয়রন, আয়োডিন ও ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি) ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অভাব যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ভেগান ডায়েট উচ্চ ফাইটেটযুক্ত হওয়ায় জিংক এবং আয়রনের অভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে যেসব দানাশস্য, ডাল বা ডালজাতীয় খাবারে জিংক ও আয়রন উচ্চমাত্রায় আছে, সে খাবারগুলো নির্বাচন করতে হবে। এ ছাড়া চা-কফি বাদ দিলে এবং ভিটামিন সিসহ খাবার গ্রহণ করলে আয়রনের শোষণ বৃদ্ধি পাবে ও রক্তশূন্যতা হবে না। অঙ্কুরিত শস্য, বীজ ও ডালজাতীয় খাবার গ্রহণের মাধ্যমে জিংকের পরিমাণ বাড়ানো যায়। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অভাব পূরণের জন্য আখরোট, ক্যানোলা তেল, সয়াবিন তেল, তিসি, চিয়া বীজ ইত্যাদি খেতে হবে। এ ছাড়া বি–১২ ও কিছু পুষ্টি উপাদান (জিংক, আয়রন, আয়োডিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি) যা এ ধরনের ডায়েটে অভাব হতে পারে, সেগুলোর জন্য ফর্টিফায়েড (খাদ্যসমৃদ্ধকরণ) খাদ্য অথবা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।

যাঁরা ভেগানিজমে আগ্রহী তাঁদের জন্য এখানে রইল কিছু পরামর্শ:

* প্রতিদিন অন্তত পাঁচ রকমের তাজা ফলমূল ও শাকসবজি বেছে নিন।

* শর্করার উৎস হিসেবে নেবেন চাল, রুটি, পাস্তা, আলু ইত্যাদি।

* আমিষের অভাব পূরণ করতে রোজ যথেষ্ট পরিমাণে বীজজাতীয় খাবার, ডাল, সয়া খাবেন।

* ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎস হিসেবে তালিকায় নানা ধরনের বাদাম রাখুন।

* দরকার হলে সাপ্লিমেন্ট বা সম্পূরক গ্রহণ করুন।