পথের কুকুর বাঁচাল স্কুলের শিশুদের, সাপের সঙ্গে লড়াই শেষে হলো মৃত্যু

স্কুলের প্রাঙ্গণে বসে ছিল শিক্ষার্থীরা। হঠাৎ এক বিষধর সাপ এল। ত্রিশের বেশি শিশু ছিল সেখানে। তাদের যে কারও বিপদ হতে পারত চোখের নিমেষেই। বীরের রূপে এগিয়ে এসে শিশুদের প্রাণ বাঁচাল স্থানীয় এক পথকুকুর। তার গল্প পড়ুন আজ।

কুকুর দেখলেই অনেকে ভাবেন, হয়তো কামড়ে দেবে। অথচ কুকুরকে উত্ত্যক্ত না করলে সাধারণত কুকুর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না
প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

ঘটনাটি ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ জেলার। সেখানকার ধিরাকুলা গ্রামের মানুষের পরিচিত এক পথকুকুর ছিল ‘কালি’। স্থানীয় মানুষই ভালোবেসে এ নাম দিয়েছিল তাকে।

‘ওডিশাপোস্ট’–এর সংবাদ অনুযায়ী, সাপের সঙ্গে কালির লড়াইয়ের সেই ঘটনার সূত্রপাত ২০ এপ্রিল সকাল সাড়ে আটটার দিকে।

শ্রী জগন্নাথ শিশুবিদ্যা মন্দিরের ত্রিশের বেশি শিক্ষার্থী স্কুলপ্রাঙ্গণে বসে ছিল তখন। হঠাৎ তাদের দিকে এগিয়ে আসে এক বিষধর সাপ। কালিও ছিল সেই জায়গাতেই।

শিক্ষক বা অভিভাবকেরা শুরুতে টেরও পাননি সাপের উপস্থিতি। সবার আগে বিপদটা বুঝতে পারে কালি। তারপর একমুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি সে। বিষধর সাপ আর শিশুদের মাঝে ঢাল হয়ে এসেছে। চিৎকার করে উঠে আক্রমণের পর আক্রমণে বিপর্যস্ত করে তোলে সাপটিকে।

ভীষণ সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় সাপটিকে। কালির আক্রমণেই মৃত্যু হয় সেটির। তবে লড়াইয়ের সময় সাপের বহু ছোবল লাগে কালির মুখে।

তীব্র ব্যথা আর বিষের প্রভাব সত্ত্বেও সাপের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় কালি। তবে সাপের মৃত্যুর কিছুক্ষণ পরে বিষের প্রভাবে মারা যায় কালিও।

গ্রামবাসীর কৃতজ্ঞতা

গ্রামবাসীর মধ্যে এই ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি। ওই মুহূর্তে এত শিশুর সেখান থেকে নিরাপদে সরে যাওয়া সত্যিই কঠিন ছিল। এলোপাতাড়ি ছুটতে গিয়ে শিশুরা হয়তো সাপটিকেই মাড়িয়ে দিত। আর তখনই হয়তো ছোবল দিত সেই বিষধর সাপ।

কালির প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে গ্রামবাসীর হৃদয়। গ্রামের পথে পথে মানুষের দয়ায় জীবন কেটেছে কালির। সেই পথকুকুর কালি বাঁচিয়ে দিয়ে গেল বহু মানবশিশুর প্রাণ।

কালির মৃতদেহ নিয়ে হয়েছে শোকমিছিল
ছবি: ভিডিও থেকে

গ্রামবাসীরা চাইলেন, কালির শেষবিদায়টুকু সম্মানের সঙ্গে হোক। নিজেদের উদ্যোগেই একটা ট্রলিতে কালির মৃতদেহটা রাখলেন তাঁরা। সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে দেন তাঁরা দেহটাকে। ফুল বিছিয়ে দেন তার দেহের ওপর।

কালির সেই মৃতদেহ নিয়ে গ্রামের মধ্যে চলে শোকমিছিল। সম্মানের সঙ্গে হয় তার শেষকৃত্য। মানবশিশুদের বাঁচাতে কালির এই আত্মত্যাগের কথা আজীবন মনে রাখবেন তাঁরা।

পথকুকুরও বন্ধু

মানুষের বিপদে পথকুকুরের এগিয়ে আসার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। যদিও পথকুকুরের প্রতি অনেকে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। আমাদের দেশে কুকুর নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আছে। অনেকেই অকারণে কুকুর ভয় পান।

কুকুর দেখলেই অনেকে ভাবেন, হয়তো কামড়ে দেবে। অথচ কুকুরকে উত্ত্যক্ত না করলে সাধারণত কুকুর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। আর কুকুর ঘেউ ঘেউ করলেই যে কামড়ে দেবে, তেমনটাও নয়।

কুকুর মানুষের পরম বন্ধু। আপনার-আমার খাবারের উচ্ছিষ্ট খেয়েই বহু কুকুর দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকতে পারে। একটি এলাকার কুকুর সেই এলাকার মানুষের বিপদে পাশে থাকবেই। স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে পথকুকুরদের জলাতঙ্কের টিকা দিয়ে রাখা ভালো। তাতে মানুষ ও কুকুর সবাই নিরাপদ থাকবে।

কুকুরের সংখ্যাধিক্যের বিষয়টিও একইভাবে সমাধান করা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণিচিকিৎসকদের সহায়তায় আপনার এলাকার কুকুরদের বন্ধ্যাকরণ অস্ত্রোপচার করিয়ে নিতে পারেন। তাহলে তাদের সংখ্যা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

মনে রাখবেন, কুকুর নিধন বা অপসারণ কোনো সমাধান নয়। আর এ ধরনের কাজ করলে আপনি দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তির মুখেও পড়তে পারেন।

সূত্র: ওডিশাপোস্ট

আরও পড়ুন