আমাজন বনের চার লাখ একর জমি কিনে নিয়েছিলেন এই ব্যবসায়ী, তারপর কী হলো
সাধারণত বনের জমি কেনেন কাঠ ব্যবসায়ীরা। জমি কিনে গাছ কাটেন অকাতরে আর কাঠ বিক্রি করে ভারী করেন পকেট; কিন্তু ২০০৫-০৬ সালের দিকে ব্রাজিলের আমাজনে সম্পূর্ণ উল্টো এক ঘটনা ঘটেছিল। এক ব্যক্তি বিশাল একখণ্ড বনভূমি কিনে নেন; কিন্তু গাছ কাটার জন্য নয়। তিনি জমি কিনেছিলেন শুধু বনের গাছ বাঁচাতে।
বনের গাছে যাতে কেউ কুঠার চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই আমাজনের চার লাখ একর জমি কেনেন ইয়োহান এলিয়াস। তিনি সুইডিশ মাল্টি-মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী এবং ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘হেড’-এর সাবেক চেয়ারম্যান।
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শুধুই গোলটেবিল বৈঠক ও লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিচ্ছিল, তখন এলিয়াস পকেটের টাকা খরচ করে সরাসরি কাজে নামেন। ‘গার্ডিয়ান’ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এলিয়াস কিনে নিয়েছিলেন আমাজনের চার লাখ একর জমি, যা আয়তনে প্রায় লন্ডনের সমান।
তাঁর এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছিল, তেমনি জন্ম দিয়েছিল তীব্র বিতর্কের। চলুন বিস্তারিত জানি।
এলিয়াসের মডেল
ঘটনার শুরুটা বেশ নাটকীয়। এলিয়াস জানতে পারেন, আমাজনের গভীরে মেদেইরা নদীর কাছে একটি বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে ‘গেথাল’ নামের এক কাঠ ব্যবসায়ী কোম্পানি। তারা তখন আর্থিক সংকটে ভুগছিল। এলিয়াস ভাবলেন, এটাই সুযোগ।
এলিয়াস সোজা ওই কোম্পানির কাছে প্রস্তাব পাঠালেন, তাদের পুরো কোম্পানি এবং ওই বনের মালিকানা তিনি কিনে নিতে চান।
২০০৫ সালে এলিয়াস প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ওই কোম্পানি এবং তাদের মালিকানাধীন চার লাখ একর বনভূমি কিনে নেন। চুক্তি সই হওয়ার পর এলিয়াস প্রথমেই তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের গাছ কাটা বন্ধ করে দেন। যে কোম্পানি এত দিন গাছ কেটে বন উজাড় করত, রাতারাতি সেটি হয়ে গেল বন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান!
‘গার্ডিয়ান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এলিয়াস বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদদের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাঁরা শুধু কথা বলেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বুঝতে পারলাম, বন বাঁচাতে হলে আমাকেই জমিটা কিনে নিতে হবে।’
এলিয়াসের এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা। আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। এই বন প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়। এলিয়াস হিসাব কষে দেখলেন, যদি এই বন সাফ করে ফেলা হয়, তবে যে পরিমাণ কার্বন বাতাসে মিশবে, তা ভয়াবহ।
তাঁর বিশ্বাস, বন রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এর অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা। অর্থাৎ গাছ কেটে কাঠ বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, গাছ বাঁচিয়ে রাখলে তার চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। তিনি এমন একটি মডেলই দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন।
‘কুল আর্থ’–এর গোড়াপত্তন
শুধু জমি কিনে কি বন বাঁচানো সম্ভব? এলিয়াস বুঝতে পারলেন, এটা স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, তিনি একা পুরো আমাজন কিনে নিতে পারবেন না। এ ছাড়া স্থানীয় দরিদ্র মানুষেরা পেটের দায়ে গাছ কাটেন। তাঁদের যদি বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না করা যায়, তবে কোনো না কোনোভাবে তাঁরা বন ধ্বংস করবেনই।
এ ভাবনা থেকেই এলিয়াস এবং ব্রিটিশ এমপি ফ্র্যাঙ্ক ফিল্ড মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কুল আর্থ’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা। তাঁদের কাজের ধরন ছিল প্রচলিত এনজিওগুলোর চেয়ে আলাদা। এই প্রতিষ্ঠান কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি বনের ভেতর বসবাসকারী আদিবাসী ও স্থানীয় গ্রামগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করে। শর্ত একটাই—গাছ কাটা যাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের স্কুল, হাসপাতাল, বিশুদ্ধ পানি, নৌকা ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করে দেন এলিয়াসরা। বিনিময়ে গ্রামের মানুষদের কথা দিতে হয়, তাঁরা তাঁদের এলাকার বন রক্ষা করবেন।
এলিয়াস বুঝতে পেরেছিলেন, বনের আসল মালিক সেখানকার আদিবাসীরাই। তাই ‘কুল আর্থ’ জমি কেনে না; বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের জমির মালিকানা ধরে রাখতে সাহায্য করে, যাতে কাঠ ব্যবসায়ীরা তাঁদের ঠকিয়ে জমি কেড়ে নিতে না পারে।
ছিল বাধাবিপত্তি
এলিয়াসের এই উদ্যোগ শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও বাস্তবে তাঁকে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিশেষ করে ব্রাজিল সরকার বিষয়টিকে মোটেও ভালোভাবে নেয়নি।
২০০৮ সালের দিকে ব্রাজিল কর্তৃপক্ষ এলিয়াসের কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তাদের অভিযোগ ছিল, একজন বিদেশি কেন ব্রাজিলের এত বিশাল অংশের মালিক হবেন? ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কজন রাজনীতিবিদ অভিযোগ করেন, এলিয়াস আদতে পরিবেশ রক্ষার নামে আমাজনের মূল্যবান খনিজ সম্পদ বা জীববৈচিত্র্য দখল করতে চাইছেন। একে তারা ‘গ্রিন কলোনিয়ালিজম’ বলে আখ্যায়িত করেন।
এমনকি ব্রাজিলের পরিবেশ সংস্থা এইবিএএমএ একবার এলিয়াসের কোম্পানিকে জরিমানাও করেছিল। যদিও এলিয়াস দাবি করেন, তিনি কোনো নিয়ম ভাঙেননি এবং ওই জমি কেনার পর সেখানে একটি গাছও কাটা হয়নি।
এলিয়াস বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন, তাঁর উদ্দেশ্য জমি দখল করা নয়; বরং তা সংরক্ষণ করা। তিনি ব্রাজিল সরকারকে ওই জমিতে এসে যেকোনো সময় তদন্ত করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্দেশ্য যে সৎ ছিল, তা অনেকটাই প্রমাণিত হয় এবং কুল আর্থ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।
এলিয়াস যেখানে আলাদা
ইয়োহান এলিয়াসের এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্র বা বড় বড় সংস্থা যা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ব্যক্তি উদ্যোগে তা করা সম্ভব। গার্ডিয়ান এবং বিবিসির প্রতিবেদনগুলোয় উঠে এসেছে, আমাজনের যেসব এলাকায় কুল আর্থ কাজ করছে, সেখানে বন উজাড়ের হার আশপাশের এলাকার চেয়ে অনেক কম।
এলিয়াসের দর্শন ছিল খুব স্পষ্ট, গাছ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। গাছ কেটে বিক্রি করার চেয়ে বাঁচিয়ে রাখলে লাভ বেশি। তিনি চেয়েছিলেন কার্বন ক্রেডিট মার্কেটের মাধ্যমে বনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে। অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, যারা কার্বন নিঃসরণ করছে, তারা আমাজনের এই বন টিকিয়ে রাখার জন্য টাকা দেবে।
বর্তমানে আমাজনের পাশাপাশি পেরু, কঙ্গো ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশেও কাজ করছে কুল আর্থ। এলিয়াসের সেই চার লাখ একর জমি কেনার ঘটনাটি ছিল একটি প্রতীকী শুরু। এটি বিশ্বকে দেখিয়েছিল, পরিবেশ রক্ষায় প্রচলিত এনজিও বা সরকারি প্রকল্পের বাইরে গিয়েও কাজ করা সম্ভব।
তবে সমালোচনাও থেমে নেই। অনেকে বলেন, একজন ধনী ব্যক্তির হাতে এত বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু এলিয়াসের সমর্থকেরা বলেন, যত দিন সরকার তাদের দায়িত্ব পালন না করছে, তত দিন এলিয়াসের মতো ধনীদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
২০০৬ সালে যখন এলিয়াস আমাজনের ওই জমিটুকু কিনেছিলেন, তখন অনেকেই তাঁকে পাগল ভেবেছিলেন। কাঠ ব্যবসায়ীরা হেসেছিলেন; কিন্তু সব বাধা ভেঙে এলিয়াস প্রমাণ করেছেন, অর্থ শুধু ভোগের জন্য নয়, অর্থ দিয়ে চাইলে পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দেওয়া যায়।
সূত্র: গার্ডিয়ান, বিবিসি ও কুল আর্থ