উচ্চশিক্ষা
নিজেই এবার নিজের অভিভাবক
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই শুরু হয়েছে প্রথম বর্ষের ক্লাস। কলেজজীবন পেরিয়ে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পা রেখেছেন, এই লেখা তাদের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছ? বেশ! এবার নিজের দায়িত্ব তোমার নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। আগের মতো কেউ আর এখন তোমাকে বলবে না, ‘এই, পড়তে বসো। সামনে পরীক্ষা!’ এমনকি ক্লাসে গেলে কি গেলে না, এ নিয়েও কেউ তাড়া দেবে না। আগে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ক্লাসে পাঠাতেন মা, পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তাগাদা দিতেন বাবা। এখনো হয়তো ক্লাস-পরীক্ষার খবর নেবেন তাঁরা, কিন্তু পড়াশোনার জন্য যেটুকু তাগাদা, সেটা নিজেকেই দিতে হবে। তবে সবকিছু বুঝে উঠতে উঠতে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই দেরি করে ফেলে। তাই এখানে কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো।
সতর্ক থাকা মানে ভয়ে থাকা নয়
তোমার এখনকার ইচ্ছা-অনিচ্ছা আর চেষ্টার ওপর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্ভর করছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক থাকা মানে ভয়ে থাকা নয়। বরং জীবনের সবচেয়ে উপভোগ্য সময় হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো বছরগুলো। বৈচিত্র্যময় কাজ ও কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময়েই ক্যারিয়ারের ভিত গড়ে নেওয়া যায়। ভালো ফল যদি করতে চাও,
শুরুতেই সেটা করে দেখাতে হবে। প্রথম সেমিস্টারে ভালো করতে পারলে পরের সেমিস্টারগুলোয় সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সহজ হয়।
স্কুল-কলেজের মতো নয়
খালি চোখেই দেখতে পাবে স্কুল-কলেজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পার্থক্য আছে। যেমন আগে তুমি পড়তে কয়েকটি বিষয়। এখন একটি বিষয়ের মধ্যে অনেকগুলো কোর্স তোমাকে পড়তে হবে। কোর্সগুলো নেবেন ওই বিষয়ে দক্ষ কোনো শিক্ষক। আগে ক্লাসের পরে তুমি হয়তো কোচিং আর প্রাইভেট পড়ার জন্য দৌড়েছ। এখন কোর্স-শিক্ষকই তোমাকে দরকারি বিষয়গুলো ক্লাসে আলোচনা করে দেবেন, কিংবা ধরিয়ে দেবেন। এখন আগের মতো রুটিন ধরে ধরে একটার পর একটা ক্লাস না-ও হতে পারে।
বিষয় নিয়ে মন খারাপ নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সাবজেক্ট বা বিষয় নিয়ে অনেকের মন খারাপ থাকে। তুমিও হয়তো তোমার বিষয় নিয়ে সন্তুষ্ট নও। যে বিষয় নিয়ে পড়তে চেয়েছিলে, সেটি হয়তো পাওনি। আসলে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বুঝতে পারে, ভর্তির ক্ষেত্রে সব বিষয়ের চাহিদা সমান নয়। তবে জেনে রেখো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয়ই খারাপ নয়। যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভালো ক্যারিয়ার তৈরি করা যায়। তাই মন খারাপ না করে বরং খোঁজ নাও, তোমার বিষয়ের ভবিষ্যৎ সুযোগ ও সম্ভাবনা কী কী আছে। এমনকি যে বিষয়ে পড়ছ, সে বিষয়েই যে ক্যারিয়ার গড়তে হবে, এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়মও নেই। তাই বলে পড়ার বিষয়টাকে হেলাফেলা করা যাবে না। তুমি বরং পড়ালেখার পাশাপাশি আরও নানা কার্যক্রমে যুক্ত হতে থাকো। অভিজ্ঞতার ঝোলা ভারী করতে থাকো। তাহলে ক্যারিয়ার নিয়ে আর দুর্ভাবনা থাকবে না।
পড়াশোনা কীভাবে
কীভাবে পড়াশোনা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেকেই বুঝে উঠতে পারে না। প্রথম কথা—নিয়মিত ক্লাস করতেই হবে। ক্লাসে মনোযোগী থেকে ক্লাসনোট তুলতে হবে। দুই ক্লাসের ফাঁকে দীর্ঘ বিরতি থাকলে লাইব্রেরিতে গিয়ে কিংবা বিভাগের সেমিনারে বসে পড়াশোনা করতে পারো। মূল বইয়ের পাশাপাশি একাধিক রেফারেন্স বইও দেখতে হবে। ভালো ফলের জন্য তোমাকে সিলেবাস সংগ্রহ করতে হবে। পুরোনো প্রশ্নপত্র জোগাড় করে সেগুলোও দেখে নিতে পারো।
পড়াশোনার পাশাপাশি অফুরন্ত সুযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আন্তহল ও আন্তবিভাগ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারো। ক্যাম্পাসে অনেক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। এগুলোর সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করতে পারো। কেউ কেউ সাংবাদিকতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। অনেকে রেডিও-টেলিভিশনের নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বিভিন্ন রকম সহায়তা
সমস্যায় পড়লে কী করতে হবে, এটা অনেক শিক্ষার্থী বুঝে উঠতে পারে না। প্রতিটি বিভাগে ছাত্র-উপদেষ্টা শিক্ষক থাকেন। যে-কোনো ধরনের সংকটে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করতে পারো। মানসিক চাপ অনুভব করলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে এবং কলাভবনে এ ধরনের কাউন্সেলিং করানো হয়। অর্থকষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য কোনো কোনো বিভাগে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকে। অনেকে প্রাইভেট টিউশনি করে কিংবা বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক রকম বৃত্তি দেওয়া হয়। সেগুলোর জন্য আবেদন করতে পারো।
কী করবে, কী করবে না
কী করবে আর কী করবে না, তা সম্পূর্ণ নিজের ওপর। তবে তোমার কাজে যেন অন্যের ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাত জেগে মুঠোফোনে পড়ে থাকা কোনো কাজের কথা নয়; বরং ভোরে উঠে ব্যায়ামাগারে যেতে পারো, দিনের কিছু সময় সুইমিংপুলে কাটাতে পারো। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে সবুজের সঙ্গে কাটানোর অভ্যাসও গড়ে তুলতে পারো।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলে অভিজ্ঞতার বিনিময় হবে, তবে কেবল আড্ডায় সময় পার করলে চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, যা-ই করো না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে হেলায় পার করা যাবে না। সময়কে কাজে লাগাতে হবে।