মা–বাবার কি প্রিয় সন্তান থাকে

মা–বাবার প্রিয় সন্তান থাকে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আপনার জানা। শৈশবেই সন্তানেরা টের পায়, মা–বাবা কোনো একজনকে বেশি স্নেহ করছেন, বেশি সুবিধা দিচ্ছেন। আপনি যদি সেই প্রিয় সন্তানটি না হন, আশঙ্কা আছে, এই কষ্ট আপনার কখনো যাবে না।

শৈশবে কখনো কখনো মনে হয়, মা–বাবা নির্দিষ্ট একজনকে বেশি বেশি আদর করছেন
ছবি: কবির হোসেন

শৈশবে কখনো কখনো মনে হয়, মা–বাবা নির্দিষ্ট একজনকে বেশি বেশি আদর করছেন। এই সন্তান বাড়তি আদর পাচ্ছে, হাতখরচ থেকে শুরু করে ঘুরতে যাওয়া, নতুন কিছু পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক পরিবারেই একজন অন্যদের থেকে বেশি পায়।

এমনকি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য দূর হয় না। সন্তানেরা বড় হওয়ার পরও মা–বাবার এমন পক্ষপাত দেখে অনেকে কষ্ট পান। দেখা যায়, হয়তো মা ঈদের দিন নির্দিষ্ট এক সন্তানের বাসায় থাকতে চাইছেন।

কোনো সন্দেহ নেই, এতে সন্তান কষ্ট পায়। সন্তান মনে করে, সারা জীবন মা–বাবা তাকে উপেক্ষা করেছেন। এই বৈষম্য আর অবহেলার অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও সব সময় সফল হওয়া যায় না। মানসিক স্বাস্থ্যে এর গভীর প্রভাব আছে।

অনেক সন্তানই এই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারে না। গত কয়েক দশকের গবেষণা বলছে, মা–বাবার পক্ষ থেকে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা মোটেও বিরল না। যেসব সন্তান নিজেদের কম প্রিয় বলে মনে করে, তারা শৈশবে বেশি মানসিক সমস্যায় ভোগে। তাদের পরিবারে সম্পর্ক দুর্বল হয়, পড়াশোনায়ও তারা পিছিয়ে পড়ে। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এর প্রভাব থেকে যায়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয় একটি প্রশ্ন করে, সে নিজেকে মা–বাবার প্রিয় মনে করে কি না। বৈবাহিক অবস্থা, চাকরি, বয়স—এসবের চেয়েও এটি জীবনে বেশি প্রভাব ফেলে। কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যই এর চেয়ে এগিয়ে আছে।

আরও পড়ুন

কারা মা–বাবার প্রিয় সন্তান

এটা গবেষণায় সহজে মাপা যায় না। কারণ, সমাজে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যকে ভালো চোখে দেখা হয় না। আদর্শ মা–বাবা কখনো স্বীকার করবেন না যে তাঁরা পক্ষপাত করেন। তাই গবেষকেরা সরাসরি মা–বাবাকে প্রশ্ন না করে ঘুরিয়ে জানতে চেয়েছেন, কোন সন্তানের জন্য আপনি বেশি সময় বা সম্পদ ব্যয় করেন? কার সঙ্গে আপনি বেশি ঘনিষ্ঠ? কার আচরণে আপনি বেশি হতাশ হন?

ড. জে জিল স্যুটর যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও গবেষক। ২০০১ সাল থেকে পাঁচ শতাধিক মাকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণা করেছেন তিনি। যাঁদের প্রত্যেকের দুই বা তার বেশি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চলেছে যে এই গবেষক এখন দাদা-দাদি বা নানা-নানিদের পক্ষপাতের প্রভাবও বিশ্লেষণ করছেন।

এই গবেষণার ফল চমকে দেওয়ার মতো। এটি দেখিয়েছে, পক্ষপাত কতটা ব্যাপক। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মা–বাবারই একজন প্রিয় সন্তান ছিল। এই পছন্দ বছরের পর বছর ধরে একই থেকেছে।

সাধারণভাবে দেখা গেছে, মেয়েরা এবং ছোট সন্তানেরা মা–বাবার বেশি প্রিয় হয়। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, শৈশবে মেয়েরা মা–বাবার কাছে ছেলেদের তুলনায় বেশি বিশেষ সুবিধা পায়। অবশ্য অনেক সময়ই মেয়েরা বড় হওয়ার পর সম্পদে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়। এটি অবশ্য সমাজভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে।

যেসব সন্তান শান্ত স্বভাবের, দায়িত্বশীল, মা–বাবার কথা মানে, তাদের প্রতি পক্ষপাত বেশি দেখা যায়
মডেল: রওনক হোসেন, শুভ ও উল্কা হোসেন। ছবি: প্রথম আলো

সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার আরও কিছু কারণ

তবে শুধু জন্মক্রম বা লিঙ্গই প্রিয় হওয়ার কারণ নয়। যেসব সন্তান শান্ত স্বভাবের, দায়িত্বশীল, মা–বাবার কথা মানে, তাদের প্রতি পক্ষপাত বেশি দেখা যায়। ব্রিগহ্যাম ইয়াং ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যালেক্স জেনসেনের মতে, ‘তাদের একটু সহজে সামলানো যায় বলেই হয়তো মা–বাবা তাদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন।’

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রিয় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মূল্যবোধের মিল। ধর্ম, রাজনীতি, জীবনদর্শন—এসব বিষয়ে মা–বাবা এবং সন্তানের ধরন একই হলে সেই সন্তান বেশি প্রিয় হয়।

মজার বিষয় হলো, যেসব বিষয় সন্তানেরা প্রিয় বা অপ্রিয় হওয়ার কারণ মনে করে, মা–বাবার কাছে সেসব বিষয় তেমন গুরুত্ব পায় না। যেমন ভালো ক্যারিয়ার, সামাজিক সাফল্য পেলে সন্তানেরা মনে করে মা–বাবা তাদের বেশি পছন্দ করবেন।

গবেষণা বলছে, এসবের তেমন ভূমিকা নেই। আবার ছেলেমেয়েরা মনে করে, আইনি ঝামেলা, আসক্তি, এসব থাকলে বুঝি মা–বাবা অপছন্দ করবেন, এটির প্রভাবও তুলনামূলক কম।

তবে গবেষকেরা বলছেন, মা–বাবা কী ভাবেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানেরা কী অনুভব করে। বৈষম্য তারা টের পেলে সেটাই মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা–বাবা ও সন্তানেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একমত হতে পারেননি, কারা বেশি সুবিধা পাচ্ছে, কতটুকু পাচ্ছে, সেটা ন্যায্য কি না।

আরও পড়ুন

সমাধান কী

সমস্যা হলো, এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে খোলামেলা কথাবার্তা হয় না। সবাই শুধু এটা অনুভব করে। কিন্তু কেউ মুখ খুলে বলে না।

এই গবেষণার ফলাফলের মূল কথা হলো, এই বৈষম্য কারও জন্যই ভালো নয়। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা খেয়াল করে, কে কেমন ব্যবহার পাচ্ছে। যারা নিজেদের কম প্রিয় বলে মনে করে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, সবকিছুর আশঙ্কা বেশি থাকে।

যদিও গবেষণা পর্যবেক্ষণমূলক, তাই নিশ্চিত করে বলা যায় না পক্ষপাতই এসব সমস্যার কারণ, নাকি মানসিকভাবে দুর্বল শিশুরাই কম আদর পায়। তবু গবেষকেরা মনে করেন, মা–বাবার উচিত অন্তত বিষয়টি নিয়ে কথা বলা।

যদি কোনো কারণে সন্তানদের আলাদা আচরণ করতে হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। কেন একজনের পড়াশোনায় বেশি সাহায্য লাগছে, কেন আরেকজনের নতুন জামা দরকার, এসব ব্যাখ্যা দিলে অনেক নেতিবাচক প্রভাব কমানো যায়।

সাধারণভাবে দেখা গেছে, মেয়েরা এবং ছোট সন্তানেরা মা–বাবার বেশি প্রিয় হয়
ছবি: প্রথম আলো

শেষ কথা

মজার বিষয় হলো, প্রিয় সন্তান হওয়া সব সময় সুখের হয় না। খুব বেশি বৈষম্য হলে প্রিয় সন্তান অপরাধবোধে ভোগে। কারণ, শিশুরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা আর ন্যায্যতা চায়। কোনো সন্তানের মনে এই কষ্ট থাকলে বয়সের সঙ্গে সেটি কমে না। ৪০ হোক বা ৬০, মা–বাবার পক্ষপাতের স্মৃতি সমানভাবে তাড়া করে।

গবেষকেরা বলছেন, মা–বাবার স্নেহ কমবেশি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তাঁদের সঙ্গেই জীবনের সবচেয়ে গভীর বন্ধন তৈরি হয়। তাঁদের কাছ থেকে আমরা নিঃশর্ত ভালোবাসা আশা করি। সেখানে যদি বৈষম্য দেখা যায়, সেই ক্ষত সহজে সারবে না।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন