ডায়াবেটিসে ক্ষুদ্র রক্তনালির রোগ
অনেকে মনে করেন, ডায়াবেটিস মানে শুধু রক্তে শর্করা বেশি। বাস্তবে ডায়াবেটিস একটি রক্তনালিভিত্তিক রোগ। এতে ধীরে ধীরে শরীরের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সৃষ্ট মাইক্রোভাসকুলার রোগ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে জীবনমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কীভাবে এ রোগ হয়
রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোটা ও শক্ত হয় রক্তনালির দেয়াল। রক্ত চলাচল কমে। অক্সিজেন ও পুষ্টির অভাব দেখা দেয় টিস্যুতে। একে বলে ডায়াবেটিক মাইক্রোঅ্যানজিও, যা ধীরে ধীরে চোখ, কিডনি ও স্নায়ু আক্রান্ত করে।
যেসব উপসর্গ দেখা যায়
ডায়াবেটিসে চোখের রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুরুতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। আলো দেখলে চোখে ঝিলমিল লাগে। হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে। দেরিতে চিকিৎসা নিলে স্থায়ী অন্ধত্ব হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর থেকেই বছরে অন্তত একবার চোখের ফান্ডাস পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
ডায়াবেটিস কিডনির ছাঁকনি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট করে। এ ক্ষেত্রে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন/প্রোটিন যাওয়া; পা, মুখ বা শরীর ফুলে যাওয়া; প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়।
ডায়াবেটিসে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাব দেখা যায়। জ্বালাপোড়া বা পুড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়ে থাকে। অবশতা বা অনুভূতি কমে যায়। ব্যথা বেশি হয় রাতের বেলা। অনুভূতি কমে যাওয়ায় পায়ে ক্ষত হলেও রোগী টের পান না। এতে সংক্রমণ, ঘা ও শেষ পর্যায়ে ডায়াবেটিক ফুট ও পা কেটে ফেলার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কারা ঝুঁকিতে, কীভাবে বুঝবেন
১০ বছরের বেশি সময় ধরে যাঁদের ডায়াবেটিস আছে তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। যাঁদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে উচ্চ মাত্রার চর্বি আছে, ধূমপান করেন, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও পরীক্ষা না করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি হয়।
ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে জটিলতাগুলো নিরীক্ষণ করতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা বুঝতে রক্তে তিন মাসের গড় শর্করা বা এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষা করা হয়। এটি বছরে তিন বা চারবার করতে হবে ও এর লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর কম, ক্ষেত্রবিশেষে ৬ দশমিক ৫-এর কম।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসার মূলনীতি
মাইক্রোভাসকুলার রোগ প্রতিরোধের প্রধান চাবিকাঠি ভালো শর্করা নিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়া রক্তচাপ ১৩০/৮০-এর মধ্যে রাখা, এ ক্ষেত্রে এসিই ইনহিবিটর বা এআরবি গোত্রের ওষুধ কিডনির জন্য উপকারী। চর্বি নিয়ন্ত্রণের জন্য স্ট্যাটিন থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে। পায়ের নিয়মিত যত্ন ও পরীক্ষা করতে হবে।
ডায়াবেটিস মানেই জটিলতা অনিবার্য নয়। নিয়মিত চিকিৎসা, সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে এ রোগ অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডা. মো. তালহা চৌধুরী, কনসালট্যান্ট, ফ্যামিলি মেডিসিন, চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা