অতিথির গাড়ি কি বাইরেই থাকবে
আমরা বলি ‘অতিথি ঘরের লক্ষ্মী।’ আতিথেয়তায় যে বাঙালির বিশেষ সুনাম আছে, তা–ও মোটামুটি সর্বজনসিদ্ধ। অথচ শহরের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট, বাসাবাড়িতে গেলে চোখে পড়ে গ্যারেজে নোটিশ, ‘অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন।’ কেউ কেউ আবার আরও এক কাঠি সরেস। সঙ্গে যোগ করেন, ‘আদেশক্রমে—কর্তৃপক্ষ।’ এই সমস্যার কি কোনোই সমাধান নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন মো. সাইফুল্লাহ
অতিথিকে ঘরে তুলে তাঁর গাড়িখানা পথে নামিয়ে দিতে হচ্ছে কেন? ‘কর্তৃপক্ষ’ মহাশয়ের কি এ ব্যাপারে কিছু করার নেই? একে তো রাস্তায় গাড়ি রাখার অনুমতি নেই, নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে। তার ওপর আমাদের শহুরে বাস্তবতায় অধিকাংশ রাস্তাই গাড়ি রাখার মতো যথেষ্ট প্রশস্ত নয়। অলিগলিগুলো তো নয়ই। গাড়ি পার্ক করা দূরের কথা, কোথাও এক–আধ মিনিটের জন্য গাড়ি থামিয়ে যাত্রী নামাতে গেলেও দেখা যায় বিরাট যানজট, লেগে যায় হট্টগোল। ‘ডাইনে ল’, ‘বাঁয়ে চাপ দে’, ‘আগে বাড়ান’, ‘পিছে নেন’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শোরগোলটা একসময় ‘চিনোস আমারে?’, কিংবা ‘চড়ায়া দাঁত ফালায় দিমু’তে গিয়ে ঠেকে।
সঙ্গে গাড়িচালক থাকলে তা–ও কিছুটা রক্ষে, একটু দূরে কোথাও পার্ক করে পাহারায় থাকতে পারেন। কিন্তু যাঁরা নিজেরাই গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালান, তাঁদের জন্য এ এক বিরাট হ্যাপা।
বাহনযন্ত্র নিয়ে এই যে এক যন্ত্রণা, এ থেকে রেহাই পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই? ঢাকার বনশ্রীর একটি অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সেক্রেটারি আসাদুজ্জামান সোজাসাপটা জানিয়ে দিলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আসলে কিছু করার নেই।’ ব্যাখ্যাও আছে তাঁর কাছে। বলছিলেন, ‘দেখেন, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট আছে মোট ১২টা। লিফট, সিঁড়ি, কেয়ারটেকারের ঘর, জেনারেটরের জায়গা বাদ দিয়ে কষ্ট করে ছয়টা গাড়ি রাখা যায়। এর মধ্যে কয়েকটা মোটরসাইকেল রাখার জায়গাও করতে হয়েছে। অতিথির গাড়ির জায়গা রাখব কীভাবে? ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকেও দোষ দিতে পারছি না। তারা তো গ্যারেজের জায়গাসহ ফ্ল্যাট বিক্রি করে। বাড়তি গাড়ির জন্য জায়গা রাখলে সেই জায়গার দাম কে দেবে?’ আসাদুজ্জামানদের অ্যাপার্টমেন্টে অবশ্য অতিথির গাড়ি বাইরে রাখার জন্য কোনো নোটিশ টাঙানো নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের মধ্যে একধরনের বোঝাপড়া আছে। জায়গা খালি থাকলে অতিথি গাড়ি রাখতে পারেন। পরে অন্য গাড়ি এলে অবশ্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। যেহেতু কেয়ারটেকার আছে, এসব দেখভালের সমস্যা হয় না। আর বাইরে গাড়ি রাখা হলেও আমাদের কেয়ারটেকার দেখেশুনে রাখেন।’
ঢাকার একটু পুরোনো এলাকা, যেমন গেন্ডারিয়া, শাহজাহানপুর কিংবা মিরপুরের মতো অনেক জায়গায় সমস্যা আরও প্রকট। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়িগুলোতে দেখা যায় গ্যারেজের জায়গাই নেই কিংবা থাকলেও খুব কম। অনেক বাড়িওয়ালা নিচতলায়ও বাসা কিংবা দোকান ভাড়া দেন, গ্যারেজের জায়গা রাখেন না। বাড়ির বাসিন্দারাই যেখানে অন্যত্র গ্যারেজ ভাড়া করে গাড়ি বা মোটরসাইকেল রাখেন, সেখানে অতিথির গাড়ির জন্য জায়গা রাখার তো প্রশ্নই আসে না।
বাড্ডায় প্রায় সাড়ে তিন কাঠা জায়গাজুড়ে বাড়ি আছে মোজাম্মেল হোসেনের (নাম প্রকাশ করতে চান না, তাই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো)। এই বাড়িতে তিনিসহ ১১টি পরিবার থাকে। কিন্তু বাড়ির নিচে গাড়ি রাখা যায় মাত্র একটা। মোজাম্মেল বলেন, ‘নিচতলায় এক পাশে একটা দুই বেডের ফ্ল্যাট, বাকিটা আগে খালিই ছিল। কিন্তু এই এলাকায় তো থাকে মনে করেন মধ্যবিত্ত লোকজন। গাড়িওয়ালা ভাড়াটে আসে খুব কম। শুধু শুধু গ্যারেজের জায়গা ফেলে রেখে তো লাভ নেই। তাই নিচে একটা অংশ দোকান করে দিয়েছি। আর গ্যারেজের চেয়ে দোকানে ভাড়াও আসে বেশি।’
আধুনিক অনেক অ্যাপার্টমেন্টে ইদানীং পার্কিংয়ের জন্যও বড় পরিসরে জায়গা রাখা হয়। সিদ্ধেশ্বরী, সেগুনবাগিচা, উত্তরার কোনো কোনো অ্যাপার্টমেন্টে যেমন দ্বিতল পার্কিংয়ের জায়গাসহ বাড়িও আছে। কিন্তু এসব অ্যাপার্টমেন্টেও আদতে ফ্ল্যাটের সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গ্যারেজ করা হয়। বেশি ফ্ল্যাট হলে জায়গাও থাকে বেশি। অতিথির গাড়ি এলে এর মধ্যেই ‘ম্যানেজ’ করে নিতে হয়।
নগর–পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক আকতার মাহমুদ বলেন, ‘মহানগরী বিধিমালায় যতগুলো ফ্ল্যাট, ততগুলো গাড়ির জন্য জায়গা রেখে বাড়ির নকশা করার কথা বলা আছে। অনেকে দেখা যায় নকশায় ঠিকই জায়গা রাখে। পরে সেখানে দোকান বা ফ্ল্যাট করে। এটা তো বিধিবহির্ভূত। কিন্তু আমাদের আইনেও আসলে অতিথির জন্য বাড়তি জায়গা রাখার কথা বলা নেই। বিদেশে আবাসিক এলাকায় সাধারণত অতিথিরা রাস্তায়ই গাড়ি রাখে। আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটা সম্ভব নয়।’
তাহলে সমাধান কী? আকতার মাহমুদ মনে করেন, একমাত্র উপায় হলো এলাকাভেদে বাণিজ্যিকভাবে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা তৈরি করা। যেখানে ঘণ্টা ভিত্তিতে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে গাড়ি রাখা যাবে।
যদি চটজলদি সমাধানের উপায় না–ই পাওয়া যায়, আপাতত নোটিশের ভাষার ক্ষেত্রে আমরা অন্তত একটু সচেতন হতেই পারি। ‘অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন—কর্তৃপক্ষ’, অমন কড়া আদেশ না দিয়ে বরং লিখতে পারেন, ‘প্রিয় অতিথি, আপনার গাড়ির জন্য জায়গা দিতে পারছি না বলে আমরা দুঃখিত।’