একাত্তরে মায়ের কোলে যুদ্ধ থেকে বেঁচেছিলাম, এবার নিজের চোখে দেখলাম আরেক ধরনের যুদ্ধ
২৪ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় ‘এমভি কেপ দাও’। জাহাজটিতে আগুন ধরে মারা যান একজন নাবিক। প্রাণে বেঁচে ফেরা ২৭ নাবিকের একজন জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী বাংলাদেশি মো. আমান উল্লাহ। তাঁর কাছে ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার গল্প শুনলেন সজীব মিয়া
ওমানের একটি হোটেলে এক সপ্তাহ কেটে গেল। আমার সঙ্গে ভারত, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের নাবিকেরা ছিলেন। সবাই বাড়িতে ফিরে গেছেন। ভিসা জটিলতায় আমি শুধু আটকে আছি। এ ভিসা জটিলতার কারণেই সপ্তাহখানেক আগে আমাকে এমন একটি দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, যেখানে আমার থাকারই কথা ছিল না।
তখন আমি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি কেপ দাও’–এর প্রধান প্রকৌশলী। গত ২৯ এপ্রিল সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজটিতে উঠেছিলাম। জাহাজ দুবাই বন্দরে নোঙর করা অবস্থায়ই আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তখনই কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম, বাড়িতে ফিরব। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানানো হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমার ভিসা রিজেক্ট হয়েছে।
৩০ বছর ধরে বিভিন্ন জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করছি। বাংলাদেশি নাবিক হিসেবে এমন অভিজ্ঞতা আমার নতুন নয়। তাই সাইন অফ করতে পারলাম না। জাহাজেই থেকে গেলাম। ১ লাখ ৭০ হাজার টন লাইমস্টোন নিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে জাহাজটি দুবাই থেকে ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করল। সকাল সাড়ে আটটার দিকে হরমুজ প্রণালিতে ঢুকি। হরমুজে যে ঝুঁকি আছে, সেটা আমরা জানতাম। আগে রাতের বেলায়ও এ পথ দিয়ে গেছি। কিন্তু এবার কী হতে যাচ্ছে, সেটা কেউ ভাবতেও পারেনি।
ছিটকে পড়লাম
২৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটার দিকে ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে ঢুকল ভারতীয় নাবিক সুরজ যাদব। আমাকে দেখে সে অবাক, ‘চিফ, আপনি এখনো ডিউটি করছেন?’
আমার আসলে তখন কেবিনে বিশ্রামের সময়। কিন্তু যাওয়া হয়নি। চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমার দায়িত্ব শুধু তদারক করা নয়। ইঞ্জিন রুমের সব মেশিনারি, পুরো জাহাজের কারিগরি দিক এবং প্রশাসনিক ও লজিস্টিকসের অনেক দায়িত্বই থাকে। তাই একটু সতর্ক থেকেই হরমুজ পার হচ্ছিলাম।
সুরজ যাদব সোফায় আমার জন্য চাদর বিছিয়ে দিল। খুবই অমায়িক ছেলে। আমার ছেলের বয়সী। ওর এটাই প্রথম চাকরি। আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে। মূলত তার কাজ ক্লিনিং।
চাদর বিছিয়ে দিয়ে সুরজ চলে গেল। সেখানেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। জাহাজটি তখনো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে। হঠাৎ পুরো জাহাজ কেঁপে উঠল। বিকট বিস্ফোরণে সোফা থেকে ছিটকে পড়লাম। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। চারদিকে অন্ধকার, ধোঁয়া, পোড়া গন্ধ আর নাবিকদের চিৎকার। শ্বাস নিতে পারছিলাম না।
মনে হচ্ছিল, হয়তো আর বাঁচব না।
কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষের বাইরে বের হলাম। তারপর সামনের দিকে ছুটে গেলাম। পথেই দেখি নিথর পড়ে আছে সুরজের দেহ।
ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
উঠল না শুধু সুরজ
একে একে সবাই জড়ো হলো। অনেকেই আহত হয়েছেন। যাঁরা আঘাত পাননি, তাঁরাও হতভম্ব। জাহাজের আবাসিক অংশ ও ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে গেছে। আমরা এসওএস (উদ্ধারের জন্য বিপদ সংকেত) পাঠালাম।
কেবিনে পাসপোর্ট, অর্থকড়ি, ব্যক্তিগত কাগজপত্র, ল্যাপটপ, এক্সটার্নাল হার্ডডিস্কসহ সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এমবিএ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম, পেশাগত বইপত্রের পাশাপাশি সেসবও আছে। কী মনে করে কেবিনের দিকে এগোলাম। চারদিকে জিনিসপত্র খসে পড়ছে। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে কেবিনে ঢুকতে পারলাম না। এর মধ্যেই সহকর্মীরা ডাকতে থাকলেন, ‘চিফ, ওদিকে যাবেন না, আমাদের কাছে চলে আসুন।’
শুধু আমার কেবিন নয়, ছয়-সাততলা আবাসিক অংশে কারও কেবিনই রক্ষা পায়নি। গায়ে থাকা বয়লার স্যুটটা ছাড়া একটা সুইও নিতে পারলাম না।
তখনই মনে পড়ল, চট্টগ্রাম নগরের এনায়েতবাজারে থাকা স্ত্রী ও তিন সন্তানের কথা। ভাবলাম, হয়তো আর যোগাযোগ করতে পারব না। বড় ছেলে সাকিবকে অডিও বার্তা পাঠালাম। আমাদের জন্য দোয়া করতে বললাম।
আমার জন্ম ১৯৭১ সালে। যুদ্ধের সময় আমার মা আমাকে কোলে নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন। ছোটবেলায় মায়ের মুখে সেই যুদ্ধের গল্প শুনেছি। এবার নিজের চোখে আরেক ধরনের যুদ্ধ দেখলাম। দেখলাম, মিসাইল কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে মানুষের স্বপ্ন, জীবন।
জাহাজের এসওএসের পাশাপাশি কোম্পানিও নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা জানাল, আমাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু তখন প্রতিটি সেকেন্ডই মনে হচ্ছিল দুর্বিষহ। মাথায় তখন একটাই চিন্তা—আবার যদি একটা মিসাইল আসে? আবার যদি আঘাত করে? হয়তো আর কেউ বাঁচব না।
প্রায় ৪৫ মিনিট পর ওমানের নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী নৌযান দৃশ্যমান হলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। একে একে আমরা ২৭ জন উঠে পড়লাম। উঠল না শুধু সুরজ।
আবার সমুদ্রে ফিরব
আমি বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ একাডেমির ১৫তম ব্যাচের ছাত্র। মা চাইতেন না আমি মেরিন পেশায় আসি। মেরিন একাডেমিতে যখন ভর্তি হই, অনেক কেঁদেছিলেন মা।
আমরা তিন ভাই, তিন বোন। আমাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো নয়। মাকে বলেছিলাম, যদি স্বাবলম্বী হতে পারি, তাহলে তোমাদেরও কিছুটা সহযোগিতা করতে পারব।
কর্মজীবন শুরুর পর ফার্স্ট ইঞ্জিনিয়ার, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারের পর ২০০৬ সালে যখন চিফ ইঞ্জিনিয়ার হলাম, মাকে বলেছিলাম, মা, আমি চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। তুমি কী চাও?
মা বলেছিলেন, ‘আমি কিছু চাই না। শুধু একবার হজ করে আসতে চাই।’
সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম, ‘তুমি এ বছরই হজে যাবে।’ শেষ পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলাম। মেরিন পেশায় থাকার কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল।
আমার বড় ছেলেও বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ একাডেমি থেকে পাস করে নাবিকের জীবন বেছে নিয়েছে।
আসলে প্রতিটি পেশায়ই ঝুঁকি আছে। নাবিকের জীবন হয়তো একটু বেশিই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এই পেশাই তো এখন আমার সব।
আবার নতুন কোনো জাহাজে ফিরব। সাগর–মহাসাগর দিয়ে ঘুরে ফিরব বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।