কতজন কত কথা বলে। তবে একবারের জন্যও কেউ বলে না, বাচ্চাকে এভাবে ধরো, এভাবে খাওয়াও। কেউ একটুও আঁচ করতে পারে না যে ওর হয়তো টেনে খেতে কষ্ট হয়। বলবে কখন? সবাই তো এটাই প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ নেই।

বাচ্চার যখন প্রায় দুই মাস, তখন তার কিছু শারীরিক সমস্যা ধরা পড়ে। সেই সমস্যার জন্যই হয়তো তার টেনে খেতে কষ্ট হতো। আর দুধ একটু বেশি বের হলেই বিষম খেয়ে যেত। আমি আবারও ডাক্তারের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে ব্রেস্ট পাম্পের সিদ্ধান্ত নিই, তার আগে ল্যাকটেশন এক্সপার্টের কাছ থেকে ব্রেস্টফিডিং বিষয়ে বিস্তারিত জানি। তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। এদিকে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতাল, ডাক্তার আর ল্যাকটেশন এক্সপার্টের কাছে ঘুরতে ঘুরতেই দিন চলে যায়। যে শিশুবিশেষজ্ঞ বাচ্চাকে বোতলে দুধ দিতে নিষেধ করেছেন, তাঁর চেম্বারের বাইরেই কোনো ব্রেস্টফিডিং কর্নার নেই। যেসব জায়গায় বাচ্চাকে টেস্ট করাতে যাচ্ছি, সেখানেও নেই। অনেক খুঁজে যেখানে পাচ্ছি, দেখা যাচ্ছে সেখানের অবস্থা খুবই করুণ। বসে থাকতেও গা গুলায়। এই সাত মাসে আমি একাধিক ক্লিনিক, ডাক্তারের চেম্বার, সুপারশপ ও রেস্টুরেন্টে গিয়ে শিশুকে ব্রেস্টফিডিং করানোর কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি। সন্তানকে বুকের দুধে উৎসাহিত করা একটা জাতির এই হলো বাস্তব পরিস্থিতি।

বিষণ্নতা, সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে চিন্তা আর নির্ঘুম রাত আমার দুধের প্রবাহ এবার সত্যিই কমিয়ে দিতে থাকে। ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট, ঘরোয়া টোটকা চলতে থাকে, কিন্তু বাচ্চা তার শারীরিক অসুবিধার জন্য ঠিকমতো খেতে পারে না। আমি তাকে এবার পুরো পাম্প করে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। একসময় সেটা পর্যাপ্ত না হওয়ায় পাশাপাশি ফর্মুলা দিতে থাকি, আর নিজেকে ভাবতে শুরু করি একজন খারাপ মা। কারণ, হাতে ফিডার দেখলেই শিশুর দর্শনার্থীরা একেকজন আঁতকে উঠত। কতজনকে যে বলতে হয়েছে, আমার বাচ্চা বুকের দুধও ফিডারে খায়। কারণ, এটা টানতে ওর অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট হয়। বাচ্চাকে বাসায় আনার পর এমন কোনো দিন নেই, আমি কাঁদিনি। বাচ্চাকে শুধু ব্রেস্টফিড করানোর জন্য কত যে উদ্ভট পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু আমি যতই চেষ্টা করেছি, সমাজ ততই আমার সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ করেছে।

তবে এ সময়ে প্রতিটি ধাপে আমি সন্তানের বাবার সাপোর্ট পেয়েছি। সে–ই আমাকে প্রথম এটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে আমি যেভাবে যা-ই বাচ্চাকে খাওয়াই না কেন, আমিই আমার সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোটা করছি। ফ্লো কমতে কমতে যখন প্রতি পাম্পে মাত্র দু–এক আউন্স দুধ আসা শুরু করল, তখন আমার কয়েকজন বান্ধবীও আমাকে সাহস জোগানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছে। আমাকে বুঝিয়েছে, একজন হাসিখুশি মা-ই একটা হাসিখুশি সন্তান বড় করতে পারে। তাই ব্রেস্টফিড না করাতে পারলেই যে আমি ব্যর্থ মা—এ চিন্তা থেকে দূরে সরে আসি।

ব্রেস্টফিডিং একটা প্রাকৃতিক ও জরুরি ব্যাপার, কিন্তু এটা কঠিন। যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রস্তুতি ও আশপাশের সবার সহযোগিতা ছাড়া এটা সফল হয় না। আমরা যেন ব্রেস্টফিডিং মাকে সম্মান করি। কিন্তু যাঁরা পারেনি তাঁদের যেন অসম্মান না করি। কারণ, প্রতিটি মা–ই তাঁর সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোটা চান।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন