‘আমার ছেলেটা যেন আমার মতো শ্রমিক না হয়’

কালীঘাট রাবারবাগানে কাজ করেন টুনি তাঁতীছবি: প্রথম আলো

ধাতব বালতি হাতে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাচ্ছিলেন টুনি তাঁতী। প্রতিটি রাবারগাছের বাকল কেটে টিনের ক্লিপ বসানো। নিচে রাখা বাটিতে রাতভর জমা হয়েছে কষ। সেই কষ বালতিতে ঢেলে নিচ্ছিলেন তিনি।

টুনির দেখা পেয়েছিলাম কালীঘাট রাবারবাগানে। কাছে যেতেই হাসিমুখে দাঁড়ালেন। কষ সংগ্রহের কাজ তখন শেষের দিকে। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি গাছ থেকে কষ সংগ্রহ করেন তিনি। বালতি ভরে সেই কষ নিয়ে যান বাগানের অফিসে জমা দিতে।

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের বাসিন্দা টুনি তাঁতীর বয়স ৪৩ বছর। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল। সংসারের হাল ধরতে ১৭ বছর বয়সে রাবারবাগানের কাজে নেমেছিলেন। ২৬ বছর ধরে এ কাজই করছেন তিনি।

রাবারগাছের বাকল কেটে দিচ্ছেন টুনি তাঁতী
ছবি: প্রথম আলো

রোজ ভোর হওয়ার আগেই বিছানা ছাড়েন টুনি। ঘরের টুকিটাকি কাজ সেরে পাঁচটার দিকে বেরিয়ে পড়েন রাবারবাগানের উদ্দেশে। বাগানে পৌঁছেই শুরু হয় কষ সংগ্রহের কাজ। একটি গাছ থেকে আরেকটি গাছে যেতে যেতে কখন যে বেলা গড়িয়ে যায়, টের পান না টুনি। থেমে থাকার সুযোগ নেই। কাজ শেষে নাশতা করেন। এরপরও বিশ্রাম নেই। রান্নার জন্য শুকনা কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, গরু-ছাগলের জন্য কাটতে হয় ঘাস। সব কাজ শেষে বাড়ির পথ ধরেন।

দিনের আলো ফুরিয়ে এলেও টুনির কাজ ফুরোয় না। বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে আবার শুরু হয় রান্নাবান্না। পরিবারের সবাইকে খাওয়ান, নিজেও খান। একসময় ঘরের বাতি নিভে আসে। রাতের নীরবতায় নেমে আসে ক্লান্তি। শীত কিংবা বর্ষা—এটাই তাঁর প্রতিদিনের রুটিন।

গাছ থেকে সংগ্রহ করা কষ
ছবি: প্রথম আলো

রাবারবাগানের নিবন্ধিত কর্মীরা দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি পান। টুনি এখনো নিবন্ধিত শ্রমিক হতে পারেননি। তাই তাঁর দৈনিক মজুরি ১৪০ টাকা। এ নিয়ে তাঁর কষ্টের শেষ নেই।

টুনির স্বামী দুলাল তাঁতী ছিলেন চা-শ্রমিক। বছর চারেক আগে তিনি মারা গেছেন। এই দম্পতির ছয় সন্তান। চার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন টুনির সংসারে সদস্য তিনজন। সংসারের ভারও তাঁর কাঁধেই।

টুনি বলেন, ‘ছোট মেয়ে আর ছোট ছেলেটা এখনো আমার সঙ্গে আছে। ওদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের চিন্তাই এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমি চাই, আমার ছেলেটা যেন আমার মতো শ্রমিক না হয়। পড়াশোনা করে ভালো কিছু করুক।’

আরও পড়ুন