বিশ্বকাপে ফুটবলারদের প্রবেশের সময় প্রটোকল দেন বাংলাদেশের তৌহিদুল
ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুর প্রতিটি ম্যাচের প্রি-ম্যাচ সেরিমনিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের তৌহিদুল ইসলাম। মাঠে পতাকা বহন থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের প্রবেশের প্রটোকল—সবই তাঁর দায়িত্বের অংশ। সেই অভিজ্ঞতার গল্প শুনেছেন সজীব মিয়া
ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে টেলিভিশনের পর্দায় যে বর্ণিল আয়োজন দেখা যায়, সেটি শেষ হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই কয়েক মিনিট নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে নেপথ্যে কাজ করেন শতাধিক মানুষ। আমি তাঁদেরই একজন। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে ফিফার সেরিমনিস টিমের সদস্য হিসেবে কখনো অংশগ্রহণকারী দেশের অফিশিয়াল পতাকা বহন করি, কখনো প্রোটোকলের দায়িত্ব পালন করি, আবার কখনো খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশের পুরো প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ করি। কোটি কোটি দর্শক যখন ম্যাচের উদ্বোধনী আয়োজন দেখেন, তখন আমিও সেই দৃশ্যেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকি।
লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে বিশ্বকাপের আটটি ম্যাচ হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচের দিন খেলা শুরুর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে শুরু হয় আমাদের কাজ। চেক-ইন শেষে ড্রেসিংরুমে চলে যাই। এরপর মাঠে পূর্ণাঙ্গ রিহার্সাল। আসল অনুষ্ঠানের মতোই জাতীয় সংগীত, পতাকা বহন, মাঠে প্রবেশ—সবকিছুর মহড়া চলে। খেলোয়াড়দের জায়গায় অংশ নেয় স্থানীয় ফুটবল একাডেমির শিশুরা। টেলিভিশনে কয়েক মিনিটের যে আয়োজন দেখা যায়, তার পেছনে থাকে কয়েক ঘণ্টার নিখুঁত প্রস্তুতি।
ম্যাচ শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে আমরা টানেলে অবস্থান নিই। নিরাপত্তার কারণে তখন মুঠোফোন জমা রাখতে হয়। ওয়ার্মআপ শেষে খেলোয়াড়েরা আমাদের পাশ দিয়েই ড্রেসিংরুমে যান, আবার কিছুক্ষণ পর আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামতে ফিরে আসেন। এ সময় বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু, স্পেনের লামিন ইয়ামালসহ অনেক আন্তর্জাতিক ফুটবলারের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও করমর্দনের সুযোগ হয়েছে। একজন ফুটবলপ্রেমীর জন্য এমন মুহূর্ত ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
দায়িত্ব পালনের সময় ভিভিআইপি এলাকার পাশ দিয়েও যেতে হয়। সেখান থেকে ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ডেভিড বেকহামসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখকে কাছ থেকে দেখেছি। নিরাপত্তার কারণে ছবি তোলার সুযোগ না থাকলেও স্মৃতিগুলো সারা জীবন মনে থাকবে।
যেভাবে পৌঁছালাম বিশ্বকাপের মঞ্চে
আমার জন্ম রাজশাহীতে। ২০২৩ সালে এমবিএ করতে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে আসি। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমার জীবনের বড় আবেগ। বিশ্বকাপ এলে পুরো পরিবার একসঙ্গে খেলা দেখতাম। আমরা সবাই ছিলাম আর্জেন্টিনার সমর্থক। খেলা দেখা, ফুটবল ভিডিও গেম খেলা আর ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল অনুসরণ করতে করতেই ফুটবল আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ফুটবলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও আগ্রহ ছিল। স্কুলে স্কাউটিং করেছি, পরে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, রোটারি ও লায়ন্স ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলাম। তখন বুঝিনি, এই অভিজ্ঞতাগুলো একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে কাজ করার সুযোগ এনে দেবে।
বাংলাদেশে থাকতেই ফিফার ওয়েবসাইটে নিউজলেটার পাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলাম। ২০২৫ সালে বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ই-মেইলে পেয়েই আবেদন করি। কয়েক মাস পর লস অ্যাঞ্জেলেসে ট্রায়আউটে ডাক আসে। সেখানে শত শত আবেদনকারীর সঙ্গে দলগত কাজ, যোগাযোগদক্ষতা ও বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার পরীক্ষা হয়। অপেক্ষার পর মে মাসে জানতে পারি, আমি সেরিমনিস টিমের জন্য নির্বাচিত হয়েছি।
প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের মধ্য থেকে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ দল নির্বাচন করা হয়, যার নাম ফ্ল্যাগ প্রটোকল টিম। এই দলের সদস্য হিসেবে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে কানাডা দলের অফিশিয়াল পতাকা বহনের দায়িত্ব পাই। টেলিভিশনে বহুবার দেখা সেই দৃশ্যের অংশ হয়ে নিজে মাঠে হাঁটার অনুভূতি সত্যিই অন্য রকম।
বিশ্বকাপ আমাকে শুধু মাঠে কাজ করার সুযোগ দেয়নি, বিশ্বের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাজ করতে করতে আমরা যেন একটি আন্তর্জাতিক পরিবারে পরিণত হয়েছি। সহকর্মীরা যখন বাংলাদেশের কথা জানতে চাইতেন, তাঁদের আমাদের দেশের ফুটবল–উন্মাদনার গল্প বলতাম। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশের সাজসজ্জার ভিডিও দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কেউ কেউ একদিন বাংলাদেশ ভ্রমণের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।
১০ জুলাই স্পেন ও বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে আমার কাজ শেষ হয়েছে। সামনে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আছে। তবে আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি, একদিন বাংলাদেশও ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলবে। আর সেই দিন যদি লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাংলাদেশের জাতীয় দলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রি-ম্যাচ সেরিমনিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই, সেটিই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।