শরতের সঙ্গে স্নিগ্ধতার যে সম্পর্ক, তা চিরায়ত। রবীন্দ্রনাথের গানে যেমন বিদেশিনীকে শারদপ্রাতে...দেখার মুগ্ধতা দেখা যায়, তেমনি শরৎ শব্দটি স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে সাদা-নীল, শিউলি ফুলের সাদা ও উজ্জ্বল কমলা রঙে। শরৎ তো এভাবেই উদ্‌যাপিত হয় বাঙালির দিনযাপনে।

default-image

নিজের মধ্যেও শরতের স্নিগ্ধতা ধরে রাখতে আরামের পোশাক পরাই ভালো। আরামের বেলায় সেরা হলো সুতি। জানালেন ডিজাইনার ও ফ্যাশন হাউস দেশালের ভাইস চেয়ারপারসন ইশরাত জাহান। তিনি বললেন, ‘শরতের পোশাকে এই সময়ের প্রকৃতির রং উঠে এলে সবচেয়ে ভালো হয়। যেমন নীল, সাদার সমন্বয় হতে পারে। প্যাস্টেলজাতীয় রংগুলো বেশ ভালো দেখায় এ সময়। আবার শিউলির বোঁটার যে অদ্ভুত সুন্দর একটা কমলা রং আছে, সেটিও পোশাকে ফুটিয়ে তুলতে পারলে অসাধারণ লাগে।’ পোশাকের উপকরণ হিসেবে সুতিই এগিয়ে আছে এই ডিজাইনারের কাছে।

সার্বিকভাবে শরতে কোন রঙের পোশাক বেশি কেনেন ক্রেতারা, জানতে চাইলাম ইশরাতের কাছে। বললেন, ‘শরতে হালকা রঙের পোশাক বিক্রি হয়। নানা শেডের নীল-সবুজের সমন্বয়ে তৈরি পোশাকগুলো বেশি চলে। এককথায় বলা চলে, প্যাস্টেল ধারার রংগুলো। এর বাইরে সাদা ও উজ্জ্বল কমলা তো আছে।’

শরৎকালে আছে এক বড় পার্বণ। বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব, দুর্গাপূজা। শরৎকালে পূজা, তাই এর নাম শারদীয় দুর্গাপূজা। ঢাকে কাঠি পড়তেই আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে শরৎ। শরৎ উদ্‌যাপনে এই উৎসব যোগ করে আনন্দের বাড়তি মাত্রা। যেহেতু উৎসব, ফ্যাশন বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। বেড়ে যায় কেনাকাটা। তবে তাতে শুধু শরতের প্রকৃতির রংই থাকে না; বরং উৎসবের রংগুলোর প্রাধান্যও চোখে পড়ে।

default-image

নগরজীবনে প্রকৃতির সব ঋতুর ছোঁয়া অন্দরেও এসে পড়ে। বসার ঘরের খাটো টেবিলে ছড়ানো পাত্রে পানির ওপর যদি ভাসতে থাকে শিউলি ফুল, তবে তা কার না নজর কাড়বে। ঘরেই তৈরি হবে শরতের আবহ, ঘরের বাসিন্দা আর ঘরে আসা অতিথি—দুইয়েই মন ভালো হয়ে উঠবে। ছাদবাগানে কিংবা যদি থাকে এক টুকরা উঠান, তবে হাফ ড্রাম বা একচিলতে মাটিতে স্থান করে নিতে পারে শিউলিগাছ। গাছে থাকা কিংবা সকাল-সন্ধ্যা গাছতলায় ঝরে পড়া শিউলি মনকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দেবে। বড় বড় ফুলদানিতে যদি রাখা যায় লম্বা ডাঁটাসমেত কাশফুল, তবে মনে হবে এক টুকরা ‘দিয়াবাড়ী’ই যেন বাড়িতে উঠে এসেছে।

কাশ, শিউলি ছাড়াও এ সময় প্রকৃতিতে দেখা যায় আরও কিছু স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল ফুল। কৃষিবিদ ও লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায়ের কাছে একটা তালিকাও পাওয়া গেল। এই সময়ের ফুল হলো সাদা টগর। পদ্ম-শাপলা বর্ষার ফুল, তবু শরতের কিছু অংশে এই দুই জলজ সুন্দরীর দেখা পাওয়া যায়। পদ্মপুকুর কিংবা লাল শাপলার জলাশয় তো এখন রীতিমতো দর্শনীয় স্থান। শরতের পুষ্পতালিকায় আছে অলকানন্দা (নগর নার্সারিতে যা অ্যালামন্ডা)। হলুদ, সাদা, লাল, গোলাপি, কালচে–লাল—নানা রঙের অলকানন্দা তার নামের মতোই সুন্দর। টবে পর্যাপ্ত পানি দিলেই ফুলের পর ফুল ফুটিয়ে বাগানির জন্য প্রতিটি দিনকেই করে তোলে আনন্দময়। উজ্জ্বল হলুদরঙা সোনাপাতি শরতের আরেক ফুল। আরও আছে নীল বনলতা। অন্য রকম এক নীলরঙা ফুল শরতে দেখা যায় বাংলার প্রকৃতিতে।

default-image

শরৎ কেন স্নিগ্ধ? একটু শুনে আসি মৃত্যুঞ্জয় রায়ের কাছে, ‘বর্ষার পর আসে শরৎ। বর্ষার বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতিতে গাছপালায় পরিবর্তন দেখা যায়। বর্ষার পানিতে প্রকৃতি সতেজ হয়ে ওঠে। সেই সতেজ ভাব শরৎকালেও থাকে। গাছপালা আর প্রকৃতিকে বেশি তরতাজা দেখা যায়।’

এই তরতাজা সতেজ ভাবটাই হয়ে উঠতে পারে উদ্‌যাপনের অনুষঙ্গ। শরতের প্রকৃতি, শরতের আবহাওয়া প্রতিটি দিনে এনে দিতে পারে স্নিগ্ধতা, একটু একটু আনন্দ। আজ বা কাল—কোনো এক শারদপ্রাতে ঘাসে থাকা হালকা শিশিরে পা ভিজিয়ে, স্বচ্ছ নীল আকাশ দেখে মনে একটু স্নিগ্ধতার ছোঁয়া লাগিয়ে শরতের উদ্‌যাপন ভালোভাবেই করা যায়।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন