চাঁদপুরের মেয়ে তানজিনা। বাড়ি ফরিদগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। এখানেই কেটেছে শৈশব। সেখানকার বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেছেন ২০১৬ সালে। পেয়েছেন জিপিএ ৫। এরপর চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ। স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। এ জন্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেলে ভর্তির কোচিংও শুরু করেছিলেন। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ ৪ দশমিক ২৫। ফলে মেডিকেলে পড়ার স্বপ্নটা তাঁর চুরমার হয়ে গেল। তানজিনার ভাষায়, ‘রেজাল্ট পাওয়ার পরই আমি টেবিল থেকে মেডিকেল প্রস্তুতির বইপত্র সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি।’

নানা জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শেষ পর্যন্ত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশন সায়েন্সের অধীনে ‘শিক্ষা’ বিষয়ে পড়ার সুযোগ পান। নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়তে না পারা নিয়ে কি আক্ষেপ আছে? বললেন, ‘কষ্ট আছে। কিন্তু আফসোস নেই। কারণ, নোবিপ্রবিতে আমি শিক্ষা নিয়েই পড়তে চেয়েছিলাম। আর সেই বিভাগেই পড়ছি।’

নতুন স্বাভাবিক, নতুন কিছু

নবম-দশম শ্রেণি থেকে নিয়মিত বিতর্ক করেন। বলছিলেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি কলেজে পড়ার সময়। নবম পাঞ্জেরী চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জেলা চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছিলাম।’

পড়াশোনার পাশাপাশি বাইরের বই পড়তে ভালোবাসেন তানজিনা। বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু হওয়ার পর মনে হতো, বই পড়া কমে যাচ্ছে। কিন্তু করোনাকালে সবকিছু বদলে যায়। অনেক বই পড়ার সুযোগ পাই। আর ক’দিন পরপরই ছুটি বাড়ছিল। একটা সময় মনে হলো, সহজে আর ক্যাম্পাসে ফেরা হচ্ছে না। তাই নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিই।’

শুরু হয় আবৃত্তি। রেকর্ড করে মাকে শোনাতেন। একসময় মায়ের উৎসাহেই একটি আবৃত্তির ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এসব স্মৃতি তানজিনার এখনো তরতাজা, ‘অডিওর সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যুক্ত করে ভিডিও আকারে ফেসবুকে আপলোড করি। দেখলাম, বন্ধুরা বেশ প্রশংসা করছে। এরপর থেকে নিয়মিত করা শুরু করি।’

বুলিং এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া

প্রথম দিকে এসব আবৃত্তির ভিডিওর খুব যে ভিউ হতো, এমন কিন্তু নয়। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ভিডিও শেয়ার করতেন তানজিনা। পরে একটা সময় ভালোই সাড়া মিলতে শুরু করে। তবে বিপত্তিও ঘটে। তানজিনা বলেন, ‘প্রথম দিকে অনেকেই এসব ভিডিওর নিচে আজেবাজে মন্তব্য করত। অনেকে আমাকে চোর বলত। কারণ, অনেকেই মনে করত, আমি অন্যের ভিডিও থেকে সাউন্ড নিয়ে ঠোঁট মেলাচ্ছি। বলত, কলকাতার বাচিক শিল্পী পারমিতা কিংবা মুনমুন মুখার্জির অডিও চুরি করেছি। দেখে আমি হাসতাম।’

ফেসবুকে তানজিনা তাবাচ্ছুমের অনুসারী (ফলোয়ার) এখন ছয় লাখের বেশি। ফেসবুক থেকে তাঁর আয়ও হয়। ইউটিউব থেকেও আয় করেন তিনি। এখন আর বুলিংয়ের শিকার হতে হয় না। এক সময় শুধু কবিতা আবৃত্তি করতেন। এখন ভিন্নধর্মী লেখাও পাঠ করেন। তিনি বলেন, ‘যে লেখা আমার ভালো লাগে, যে লেখায় ইতিবাচক প্রেরণা পাই, সেই লেখাই পাঠ করি।’ বই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এসব লেখা সংগ্রহ করেন। কবিতার বাইরে অন্য লেখা পাঠের কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘কবিতা আসলে সবার জন্য নয়, এটা স্বীকার করতেই হবে। গল্প বলা বা উপস্থাপন দিয়ে সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। এ জন্যই এমন লেখা বেছে নেওয়া।’

এখন চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন তানজিনা। পড়াশোনা শেষে কী করবেন? বললেন, ‘ভালো লাগার জায়গা থেকে আবৃত্তি করি। শখের জিনিস করতে আসলে গায়ে লাগে না। এখান থেকে ঠিক কত আয় হলো, সেটাও আমার জন্য খুব বড় ব্যাপার না। ভবিষ্যতে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।’