‘ছেলেই আমার ডিপিএস’, বললেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া শামীমের বাবা

ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়েছেন মো. শামীম শাহরিয়ার
ছবি: শামীমের সৌজন্যে

পড়াশোনা ঢাকা মেডিকেল কলেজে। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন মো. শামীম শাহরিয়ার। কিন্তু যোগদানের দিনই আসে ৪৪তম বিসিএসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে মৌখিক পরীক্ষার ডাক। এ এক মধুর দোটানা!

কৃষক বাবার পরামর্শে মৌখিক পরীক্ষাটি বেছে নেন শামীম। হয়ে যান প্রথম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে গেজেটে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়নি।

শামীমের বাড়িতে একদিন

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার নলপুকুরিয়া গ্রামে শামীম শাহরিয়ারের বাড়ি। বাবা মো. হাতেম আলী কৃষক। মা আসমা বেগম গৃহিণী। শামীমেরা দুই ভাই–বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে। পুঠিয়ার ধোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শামীমের শিক্ষাজীবন শুরু। রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। ২০২০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি।

পুঠিয়ার ধোপাপাড়া বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার মাটির রাস্তা দিয়ে একদিন শামীমের বাড়ি হাজির হই। মা–বাবা তখন বাড়িতেই ছিলেন। প্রায় ২৫ বছর আগের ইটের গাঁথুনির ওপরে টিনের চালাঘর। এত বছরেও দেয়ালে প্লাস্টার করা হয়নি। জরাজীর্ণ টিনের চালা দিয়ে বৃষ্টি পড়ে। শামীমের ঘরের দরজা খুলতে গিয়ে একাংশ খুলে পড়ল। বাবা হাতেম আলী বলেন, ‘ছেলেই আমার “ডিপিএস”। ঘরবাড়ির দিকে তাকাতে পারিনি। পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া ছেলের নাম যদি গেজেটে না আসে, প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা আমার নেই।’

শামীমের বাবারা চার ভাই। ছোট চাচা হাফিজুর রহমান শুধু পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে এসএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেন তিনি। সেই ছবি পত্রিকায় ছাপাও হয়। ছবিটি শামীমের পড়ার টেবিলের সামনে টাঙানো ছিল। সেই ছবি দেখেই শিশু শামীমের স্বপ্ন দেখার শুরু।

যেভাবে বেড়ে ওঠা

‘মা–বাবা আমাকে কোনো দিন পড়তে বসতে বলেননি,’ বলেন শামীম। ‘তাঁরা সব সময় অনুপ্রাণিত করতেন, যেন পড়াশোনা উপভোগ করি। বাবা বলতেন, তুমি পড়তে থাকো, জানতে থাকো, চেষ্টা করতে থাকো। রেজাল্ট যেমনই হোক, আমার আপত্তি নাই।’

এই অবাধ স্বাধীনতার সুবাদেই স্কুলজীবনে প্রচুর ‘আউট বই’ পড়েছেন শামীম। নানা বই পড়তে পড়তেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নানা বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ঠিক করেন, বিসিএস দেবেন। শামীম বলছিলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে একাডেমিক পড়ালেখার খুব চাপ ছিল। এর ফাঁকে ফাঁকেই টুকটাক ফিকশন, নন–ফিকশন পড়েছি। এমবিবিএসের পরের সময়টা ছিল সবচেয়ে মজার। বিসিএসের গাইড বইয়ে হয়তো কোনো বইয়ের নাম পেলাম, হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতে চলে যেতাম। সেই বই কিনে পড়া শুরু করে দিতাম। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রায় সব একাডেমিক বই পড়ে ফেলেছি। অনেক কিছুই হয়তো বুঝিনি, তবু পড়া চালিয়ে গিয়েছি। ভালো লেগেছে। আমাদের বন্ধুদের একটা পাঠচক্রের মতো ছিল। আমরা পড়তাম, ওই বিষয় নিয়ে তর্ক করতাম, গল্প করতাম।’

শামীমের মা–বাবা
ছবি: লেখক

সফলতা কোনো গন্তব্য নয়

জীবন নিয়ে শামীমের দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা। পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও গেজেটে নাম আসেনি, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে হতাশা নেই। বলছিলেন, ‘অনেক পরিশ্রম করেও তো ব্যর্থ হতে পারে মানুষ। আমি মনে করি, সফলতা কোনো গন্তব্য নয়, এটা একটা যাত্রা। শতভাগ চেষ্টা করার পরেও যদি কিছু না পাই, তাতেও আমি খুশি। কারণ, এই যাত্রায় অনেক অভিজ্ঞতা তো হবে।’

গেজেটে নাম প্রকাশের জন্য আবেদন করেছেন এই তরুণ। আশায় আছেন, এবার হয়তো সুখবর মিলবে।