বিজ্ঞাপন

রুকিয়ার এবারের কাজ দিয়েই শুরু করা যাক। তিনি নারীদের পোশাক তৈরি করেছেন। সবই স্ক্রিন প্রিন্ট-নির্ভর। এসব শিলুয়েট যে কারও নজর কাড়বে। এবারের কাজ এবং আগের কাজ দেখে ধারণা করতে অসুবিধা হয় না স্ক্রিন প্রিন্টে তাঁর মুনশিয়ানা। তবে তিনি আক্ষেপ কররে বললেন, ‘আমি ১৬-১৮ পরতে কাজ করতে পছন্দ করি। কিন্তু নিজে থাকতে না পারার পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে আমি আমার ডিজাইনকে কমিয়ে আনি ৬-৮ লেয়ারে। কাজ হয়েছে ঢাকায় আর লন্ডন থেকে আমি তদারক করেছি। এভাবেই এবারের কালেকশন আলোর মুখ দেখেছে।’

default-image

কথায় কথায় বললেন, ‘আমাদের দেশে অনেকেই ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি পরে থাকে। বিশেষ করে হুজুররা পিরহান পরেন। আমি শেষবার বাংলাদেশে এসে এমন পোশাক দেখে প্রাণিত হই। তখনই মাথায় কাজ করে এই শিলুয়েট নিয়ে একটা কালেকশন করার। সেটাই করেছি চল-এর সঙ্গে।’

এই শিলুয়েটকে অনায়াসেই লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হিসেবে চালিয়ে দেয়া যাবে, আর নারী-পুরুষনির্বিশেষ পরতেও পারবে।

default-image

নিজেই মডেস্ট ফ্যাশন অনুসরণ করেন। কাজও করেছেন লন্ডনের একটি মডেস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডে। ইসলামিক ডিজাইন হাউস। তবে টেক্সটাইল ডিজাইন নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আলেকজান্ডার ম্যাককুইনে তিনি ইন্টার্ন করেন। সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাকে অনন্য বলে বর্ণনা করেছেন রুকিয়া। বলেছেন, ‘বলতে গেলে আমার সারা জীবনের প্রেরণা হয়েছে সেখানকার কাজের অভিজ্ঞতা। লেআউট, রং, প্রিন্ট, প্যাটার্ন—সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে। প্রতিটি পোশাক যেন গল্পকথক হয়ে ওঠে।’

সেই প্রেরণাই হয়তো-বা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তাঁকেও গল্পকথক করে তুলেছে। রুকিয়াও তাই নিজের সৃজনের মধ্যে দিয়ে গল্প বলে চলেছেন। রঙে, প্যাটার্নে, শিলুয়েটে, প্রিন্টে প্রতিভাত হচ্ছে সময়ের গল্প, স্থানের গল্প, মানুষের গল্প।

default-image

তিনি আরও অনুপ্রেরণা পান এমিলিও ডে লা মোরেনার কাজে। ঐতিহ্যবাহী অ্যামব্রয়য়ডারি টেকনিক, কমপ্লেক্স স্ট্রাকচারাল শেপস, এসবেলিশমেন্টস, রাফল আর পোশাকের গতিময়তা তাঁকে মুগ্ধ করে। দারুণ প্রতিভাবান এই ডিজাইনারের সঙ্গে প্রিন্ট ইনটার্ন হিসেবে তিনি ২০১২ সালে কাজ করেছেন।

এখন তিনি একটি বাচ্চাদের স্কুলে পড়ান। তাই সময় আগের থেকে অনেক কমেছে সৃজনের ভুবনে বুঁদ হয়ে থাকার। তবুও প্রেরণা তিনি এখান থেকেও পান। সৃষ্টির রসদ এই বাচ্চাদের সঙ্গে থেকেও ঠিকই সংগ্রহ করে নেন।

২০১৩ সালে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেবার তিনি বেনারসি নিয়ে কিছু কাজ করেন। এরপর সময় গড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে আবারও আসেন। কিন্তু ফিরে যান মন খারাপ নিয়ে। সেবার সিলেটে একটি লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে তাঁর নকশা দেখে তিনি সেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করলে যে ব্যাখ্যা পেয়েছিলেন, তা তাঁকে নিদারুণ হতাশ করে।

তবে এসব ছোটখাটো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে নতুন করে ভাবেন বাংলাদেশকে নিয়ে। ঢাকার হট্টগোল, রিকশা, মানুষ, রাস্তা তাঁর ভাবনাকে উসকে দেয়। সৃজনের মুড বোর্ডে আলো ছড়ায়।

default-image

একটু একগুঁয়ে স্বভাবের। সেটা তিনি নিজেই স্বীকার করেন। তাই নিজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নাপছন্দ্ তাঁর। এ জন্য মাও বাদ সাধেননি তাঁর সৃজনের জগতে পা রাখায়। তবে মাকে নিয়ে ভীষণই ভাবেন। কারণ, তাঁর বড় হয়ে ওঠায় মায়ের ভূমিকা একধারে মা ও বাবার। সে কথাও বলছিলেন তিনি দূরালাপনে। তাঁর বয়স তখন মাত্র চার। তাঁর ভাই এক বছরের। তাঁর লন্ডনে পাড়ি জমান। এর এক বছরের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। বাকিটা জীবন মাকে একাই সামলাতে হয়েছে। একেবারে নতুন এক দেশ, পরিবেশ। সেখানে তাঁর স্ট্রাগলটা ছিল সাংঘাতিক, যেটা আজ অনুভব করতে পারি কিছুটা হলেও, বললেন রুকিয়া অকপটে।

ছোট থেকেই পোশাক তাঁকে নানাভাবে আকর্ষণ করত। বিশেষ করে উৎসব আর উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনকে দেখতেন সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি পরতে। সেসবের রং, নকশা, কাজ, কাপড় মুগ্ধতা ছড়াত। ক্রমেই তিনি পোশাকের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। পোশাকের নকশায় একাত্মতা বোধ করতে থাকেন। এভাবেই নকশাজগতের স্বপ্নচারী হয়ে ওঠেন।

default-image

তবে পোশাক নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি সচেতন ভুবনবাসীর ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হন। ফ্যাশনের দূষণ তাঁকে ভাবায়। ফাস্ট ফ্যাশনের নেতিবাচক দিক তাঁকে পীড়া দেয়। ফলে ফ্যাশনকে টেকসই করার কথা ভাবেন। নিজের কাজেও সেই অনুশীলনকে অগ্রাধিকার দেন। তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্বৃত্ত উপকরণ ব্যবহার নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে রুকিয়ার।

একজন টেক্সটাইল ডিজাইনার রুকিয়া। আবার ফ্যাশন ডিজাইনারও। কিন্তু এর বাইরে তিনি একজন ফটোগ্রাফার। পেশাদার ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজও করেছেন। ২০১২ সালে তিনি দ্য প্ল্যাটফর্মের ফটোগ্রাফি এডিটরের দায়িত্ব পালন করেন। একাধারে তিনি তিনটি ভূমিকায় সফল। বর্তমানে বুনন শিখছেন রুকিয়া। সৃষ্টির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, এই প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে।

তবে একজন ডিজাইনার হিসেবে সৃজনের যে ভাবনাই আসুক না কেন, তাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে রুকিয়ার আত্মবিশ্বাসী উত্তর ছিল, স্কিল থাকলে হবে। তিনি মনে করেন, ভাবনার বাস্তবায়নে ছোট ছোট অনেক উপাদানের প্রয়োজন পড়ে। সেগুলো গুছিয়ে এক জায়গায় করতে পারলেই কাজটা সহজ হয়ে যায়।
তাঁর মধ্যে দ্বৈত সত্তা কাজ করে। একদিকে তাঁর বর্তমান দেশ, সেখানকার পরিবেশ, আবহ আর সংস্কৃতি।

default-image

অন্যদিকে তাঁর শিকড়, পূর্বপুরুষের দেশ, সংস্কৃতি। তাই তিনি ব্রিটিশ হয়েও বাংলাদেশি, আবার বাংলাদেশি হয়েও ব্রিটিশ। আর উভয় সত্তার সহাবস্থানে তিনি আন্তর্জাতিক। এই সম্মিলন ধরা পড়ে তাঁর কাজে। তাই গামছা অনায়াসেই স্কার্টের মৌলিক কাপড় হয় যায়। ঢাকার কোলাহল তাঁর প্রিন্টের প্রেরণা হয়। আবার পিরহান বা জোব্বা নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। এভাবেই দুই দেশ, সংস্কৃতি ও পরিমণ্ডল, মানুষ ও রুচি তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে যাচ্ছে। ঘটছে পুব-পশ্চিমের মেলবন্ধন; তা সে প্রিন্টে হোক বা পোশাকে।

তবে যেটাই হোক, ঘুরেফিরে তাঁর মাথায় কাজ করে বাংলাদেশে কিছু করা। আগে প্রতিবছরই এসেছেন একবার করে। আপাতত করোনার জন্য উড়াল দিতে পারছেন না। বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয়েছে। ভালো কাজ কেউ কেউ করছেন বলেও জানিয়েছেন। আর নিজেও চান বাংলাদেশে তাঁর একটা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত করতে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এটা রয়েছে অগ্রাধিকারের তালিকায়।
টেকসই ফ্যাশন, প্রাকৃতিক রং তাঁকে উদ্বুদ্ধ করছে ভবিষ্যতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

আপাতত তিনি দূরে বসে বাংলাদেশের জন্যই ডিজাইন করেছেন। আর সেটাই লঞ্চ করেছে চল। এর মূল প্রতিষ্ঠান পারার অন্যতম উদ্যোক্তা রুহুল আবদীন ও একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই রুহুলের সঙ্গে পরিচয় রুকিয়ার। সেই সময়ে একসঙ্গে কাজ করেছেন। সেই সম্পর্কই এই নবায়িত হয়েছে এই সংগ্রহ তৈরির মধ্যে দিয়ে।

রুকিয়ার সৃষ্টিতে স্পষ্ট প্যাটার্ন আর টেকশ্চারের হৃদ্যতা। এখানে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর ম্যাককুইন-অনুরাগ। অবশ্য এই প্যাটার্ন সৃজনের পথকে সুগম করে বলে বিশ্বাস করেন রুকিয়া, যেখানে প্রতীয়মান হয় আবেগের কথামালা; যে আবেগ আবর্তিত কোনো বস্তু কিংবা চরিত্রকে ঘিরে।

default-image

মূল নকশা তৈরি হওয়ার পরও কিন্তু থেকে যায় ভাবনার সেই রেশ; যা ডিজাইনারের সঙ্গে দর্শককেও সমানভাবে আন্দোলিত করে। ঠিক যেমন রুকিয়ার বর্তমান কালেকশন। রং, প্যাটার্ন, শিলুয়েট, টেকশ্চার অবশ্যই উসকে দেবে ভাবনা। শোনাবে গল্প অনবদ্য কথক হয়ে।

পুনশ্চ: রুকিয়া এই সংগ্রহে ড্রেস ছাড়াও রয়েছে শাড়ি। সবই স্ক্রিন প্রিন্ট করা।

কৃতজ্ঞতা: চল

ফ্যাশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন