বেইজিংয়ের নাইকি স্টোর
বেইজিংয়ের নাইকি স্টোরছবি: রয়টার্স

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কয়েক দশক ধরে নারী-পুরুষের মন জুগিয়ে চলেছে জিনস; এর সহজলভ্যতা ও সহজে পরা যায় বলে। কিন্তু আপনি কি জানেন আপনার ওয়ার্ডরোবের সযত্ন কোনায় রক্ষিত প্রিয় জিনসের সুতার তুলো আসে পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে? জানা আছে কি সেই তুলো উৎপাদনের পেছনের নিপীড়ন ও শোষণের ইতিকথা? বা সেই তুলা চাষের পদ্ধতি নৈতিকতা সমর্থিত কি না?

default-image

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে চীন দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের সর্ববৃহৎ প্রদেশ শিনজাংয়ে; যেখানে উৎপাদিত হয় পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ তুলা। শিনজাং তুলা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তুলা। এই অঞ্চলটির সরকারি নাম শিনজাং উইঘুর অটোনোমাস রিজিয়ন (এক্সইউএআর)।

বিজ্ঞাপন

এখানেই বাস করে সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠী; যারা পরিচিত উইঘুর নামে। এখানে লক্ষাধিক উইঘুর রয়েছে। এদের নিজস্ব ভাষা আছে, যার সঙ্গে তুর্কি ভাষার সাযুজ্য রয়েছে। এরা নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক এবং জাতিগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে করে। সামগ্রিকভাবে এরা শিনজাংয়ের অধিবাসীদের প্রায় অর্ধেক। সাম্প্রতিককালে হান চাইনিজরা, যারা চীন দেশের সংখ্যাগুরু, বড় সংখ্যায় শিনজাংয়ে প্রব্রাজন করেছে। ফলে উইঘুরদের সংস্কৃতি এবং জীবিকা বিপদগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা মনে করছে।

default-image

বিবিসির তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর ৫ লাখ উইঘুর কর্মচারীকে জোর করে বাধ্য করা হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চরম প্রতিকূল পরিবেশে তুলা উৎপাদনে। চীনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ যে তারা উইঘুরের সংখ্যালঘুদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন করে চলেছে। গণধর্ষণ এবং যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এনেছেন নারীরা। এমনকি জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে।

কোয়ালিশন টু এন্ড ফোর্সড লেবার ইন দ্য উইঘুর রিজিয়নের সদস্য অ্যান্টিস্লেভারি ইন্টারন্যাশনাল ও ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস। এদের দাবি অনুযায়ী, উইঘুরসহ পুরো চীন দেশে উৎপাদিত সব তুলা, কাপড় উৎপাদনকারী যেকোনো ব্র্যান্ড, বর্তমানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে ব্যবসায়ে লাভবান হচ্ছে।

default-image

এই তুলা ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা কঠিন। কারণ, এই তুলা আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে মিশে হয়ে যায়। অথচ স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে চৈনিক তুলা উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক তুলা রপ্তানির ২০ শতাংশ আসে শিনজাং থেকে।
অথচ সমগ্র সরবরাহ চেইনের মাত্র একটি ধাপের সঙ্গে পরিচিত থাকেন কাপড় ব্যবসায়ীরা। এই যেমন ব্যবসায়ীরা শার্ট কিনে থাকে শার্ট উৎপাদকদের কাছ থেকে। অথচ তারা জানে সেই কাপড়ই-বা কোথা থেকে এসেছে কিংবা সেই কাপড় কোন স্পিনিং মিলে তৈরি হয়েছে বা সেই মিল তুলা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে, আবার সেই তুলাই-বা কোন দেশের কোন অঞ্চল থেকে এসেছে। সুতরাং কোন দেশের কোন অঞ্চলের চাষের তুলা থেকে একটি শার্ট হয় তা নির্ণয় করা কঠিন বা বলা যেতে পারে প্রায় অসম্ভব।

বিজ্ঞাপন

তুলার কারখানার সার্টিফিকেশন স্কিম (ওয়াইইএসএস) সংগ্রাম করে চলেছে জোর করে শ্রম বন্ধের জন্য। কিন্তু ক্রেতা হিসেবে আমার-আপনার কাছে এই তথ্য যথেষ্ট নয়। কোনো জিনস পছন্দ হলে সেটা কেনার আগে এর উৎপাদনের আদ্যপান্ত জানার অধিকার যেমন আমার আছে, তেমনি সেটা জানার ক্লেশটুকু নিতেও হবে। কারণ, ক্রেতা হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব বৈকি।

default-image

কমন অবজেকটিভের ক্লেয়ার লিসাম্যান বলেছেন, নিজের জিনসটি যে তুলা দিয়ে তৈরি হয়েছে, তার উৎস সন্ধানে আগ্রহী হলে সয়েল অ্যাসোসিয়েশনের অর্গানিক তুলার বা ন্যায্য বাণিজ্যের কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করুন। কারণ, এগুলো টেকসই ফ্যাশন সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত।

চীন যদিও উইঘুর শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার ও জোর করে শ্রমের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্যানুযায়ী, তারা সংখ্যালঘুদের ওপরে অত্যাচার নয়, তাদের পুনঃশিক্ষিত করতে চায় সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে। তাদের বক্তব্য, শিনজাং প্রদেশে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ জন্ম নিয়েছে, যার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে ও নগরজীবনে অশান্তি দেখা দিয়েছে।

default-image

এই বিশৃঙ্খলা দমনের উদ্দেশ্যেই উইঘুর সংখ্যালঘুদের পুনরায় শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছে চীন।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই তুলা বলপ্রয়োগ করা শ্রমের ফসল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেদারল্যান্ডসসহ অনেক দেশই চীনের এই কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা করেছে।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের সরবরাহ চেইন থেকে শিনজাং তুলাকে ব্রাত্য করায় চীনের জনগণ ও সেলিব্রিটিদের প্রবল প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে। এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় নাইকি ও এইচঅ্যান্ডএমের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চীনের মানুষ। এমনকি অ্যাডিডাস, কেলভিন ক্লেইন ও নাইকি পণ্যদূত হিসেবে হারিয়েছে চীনের তারকাদের। বারবেরি হারাতে বাধ্য হয়েছে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর চীনা অভিনেত্রী জৌ দোংইউকে।

default-image

মানুষ হিসেবে আমাদের ক্রয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে পণ্যের মান, বর্ণ, গন্ধসহ আরও অনেক বিবেচ্য বিষয় থাকতে পারে। এর সঙ্গে সেই পণ্যের উৎপাদনের ইতিহাস আর নৈতিকতার মতো তথ্যও ক্রেতা হিসেবে আমাদের অবগত থাকা উচিত। পাশাপাশি দায়িত্বশীল ক্রেতা হয়ে ওঠার পাশাপাশি আমরা পণ্য ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় মানবজাতি, পরিবেশ আর পৃথিবীর যত্নও যেন নিতে পারি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান

লেখক: ডেটা অ্যানালিস্ট ও পিএইচডি রিসার্চার, বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট

বিজ্ঞাপন
ফ্যাশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন