শাড়ি–অনুরাগ


যুগটা যেমনই হোক, শাড়ির আবেদন চিরন্তন ও সর্বজনীন। বাঙালি নারীর শাড়ির প্রতি রয়েছে অন্য রকম ভালোবাসা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি নারীর ফ্যাশনে অনেক কিছুর সংযুক্তি আর বিযুক্তি ঘটলেও এই একটি পোশাক কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। নতুন নতুন রূপে ফিরে এসেছে বারবার।

default-image

তবে টেক্সটাইল বিপ্লবের এই যুগে সবাই এখন ঝুঁকছে যন্ত্রে তৈরি কাপড়ের পোশাকের দিকে। শাড়ির ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। তাই আমাদের হাতে বোনা দেশীয় তাঁতের শাড়ি, যা একান্তই আমাদের দেশের নিজস্ব পরিচয় বহন করে, সেগুলোর জনপ্রিয়তাও আগের থেকে অনেক কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এমন একটা সময়ে যখন আমাদের দেশীয় শাড়িশিল্প অনেকটাই বিলুপ্তির হুমকির সম্মুখীন, এই পরিস্থিতিতে ‘বিনোদিনী শাড়িজ’ ভেবেছে দেশীয় বয়নশিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা। উদ্যোগ নিয়েছে দেশীয় শাড়ির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার। হস্তচালিত তাঁতে বোনা সুতি, জামদানি, হাফ সিল্কসহ আরও নানা রকম শাড়ি নিয়ে কাজ করছে এ প্রতিষ্ঠান।

default-image

বিনোদিনী শাড়িজের শুরুটা হয় আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। সংগীতা ফেরদৌস অমি ও নাঈমা জামান লোপা নামের দুই বান্ধবী একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়তেন। দেশীয় শাড়ির প্রতি দুজনেরই ছিল অগাধ, শর্তহীন ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা ভাগাভাগি করে নিতে নিতেই একদিন ঠিক করে ফেলেন শাড়ি নিয়েই করবেন কিছু একটা। কিন্তু তার আগে দেশীয় শাড়ির ঐতিহ্যকে আরও কাছ থেকে জানাটা ছিল জরুরি।

default-image

শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পোশাকগুলোর একটি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার নারীরা শাড়ি পরে থাকেন। তবে আমাদের দেশীয় শাড়ির রয়েছে আলাদা একটা ইতিহাস। এসব শাড়ি আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় আমাদের দেশের বয়নশিল্পীরা এসব শাড়ি বুনে আসছেন। প্রতিটি শাড়ি বুননের পেছনে থাকে বয়নশিল্পীদের ধৈর্য আর অক্লান্ত পরিশ্রম। আর তাই তো প্রতিটি শাড়িই হয়ে ওঠে একেকটি গল্প।

কী করে তারা প্রতিটি শাড়িতে এমন জীবন এঁকে চলেন, সেটাই জানতে চেয়েছিলেন অমি আর লোপা। তাই দুজনে মিলে একসঙ্গে নেমে পড়েন মাঠে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটান এসব প্রান্তিক বয়নশিল্পীদের সঙ্গে। ধারণা পেলেন তাঁদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে। তাঁদের জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ -বেদনা অনুভব করলেন কাছ থেকে। শাড়ি বয়নের শুরু থেকে শেষটা দেখলেন সামনে থেকে। বয়নশিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পণ্যকে তাঁরা যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার কথা ভাবলেন।

default-image

এরপর শুরু হয় তাঁদের বিপণন অভিযাত্রা। অনলাইনে সঠিক মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বয়নশিল্পীদের তৈরি শাড়িকে তাঁরা ছড়িয়ে দিতে থাকেন সবার মধ্যে। পৌঁছে দিতে শুরু করেন আগ্রহী ভোক্তার কাছে। বিক্রির ন্যায্য অংশ তাঁরা বয়নশিল্পীদের প্রদান করে থাকেন। এতে বয়নশিল্পীদের ক্ষমতায়ন ঘটে। পেটের দায়ে যুঝতে থাকা যেসব বয়নশিল্পী কেবল ভালোবাসার টানে তাঁদের পূর্বপুরুষের এই ব্যবসাটায় টিকে ছিলেন, সংখ্যায় কম হলেও অমি ও লোপার এই ছোট্ট পদক্ষেপ তাঁদের জীবনে বেশ ফলপ্রসূ প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়। এর ফলে তাঁরা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস আর উৎসাহ পান।

বিজ্ঞাপন

বিনোদিনী শাড়িজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো প্রতিটি শাড়ির লেআউট নকশা। সেখানে মোটিফের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিস্তার চোখে পড়ার মতো। একই সঙ্গে কালার কম্বিনেশন, যা প্রতিটি শাড়িকে নান্দনিক করে তোরার পাশাপাশি দেয় গ্রেস ও এলিগ্যান্স। প্রতিটি শাড়ির পেছনে দুই উদ্যোক্তার ভাবনা ও তার বাস্তবায়ন-প্রয়াস স্পষ্ট। ফলে শাড়ির নিত্যনতুন সংগ্রহ শাড়িপ্রিয়দের দৃষ্টি এড়ায় না, তা বাজি রেখে বলা যেতে পারে।

default-image

বিনোদিনী শাড়িজের যাত্রার শুরু থেকে এখন অব্দি তাদের সঙ্গে কাজ করা বয়নশিল্পীদের অনেকেরই জীবন বদলেছে। অনেক বয়নশিল্পীরই তাঁতের সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পূর্ণোদ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা। বিনোদিনী শাড়িজকে পাওয়া যাবে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তাদের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল (https://www.instagram.com/binodini_sarees/) আর ফেসবুকে (https://www.facebook.com/Binodini.101)।

ছবি: বিনোদিনী শাড়িজ ও এর ইনস্টগ্রাম হ্যান্ডল

ফ্যাশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন