শাড়ি বাঙালি ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ
শাড়ি বাঙালি ঐতিহ্যের অনুষঙ্গছবি: শাড়ি পোয়েম, ইশিতা আজাদের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

জীবনের বিভিন্ন সময় কেটেছে ঢাকা, লন্ডন, নিউইয়র্কে। ১০ বছর ঢাকায় থেকে গত বছর আবার ছুটেছেন লন্ডনে। এভাবেই কাটছে ঈশিতা আজাদের জীবন। দেশ বা বিদেশ, যেখানেই থাকেন, হুটহাট শাড়ি পরতে পছন্দ করেন। মা কবি শামীম আজাদকে শাড়ি পরতে দেখেই তাঁর এই শাড়িপ্রীতি। আর এখন বাঙালির ঐতিহ্য শাড়ি যাতে হারিয়ে না যায়, সে ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছেন ইনস্টাগ্রামে।

default-image

ঈশিতা আজাদ বলেন, এখন অনেকেই শাড়ি পরার বিষয়টিকে ঝামেলার মনে করেন। বিদেশে থাকলে তো কথাই নেই। অথচ স্বল্প দামের সুতি শাড়ি পরেও যেকোনো মিটিং বা অনুষ্ঠানে যাওয়া যায়, যা অন্য পোশাকে তেমন সম্ভব হয় না। আর প্রতিটি শাড়ির পেছনেই থাকে কোনো না কোনো স্মৃতি। সেটি মা, প্রেমিক বা স্বামীর দেওয়া প্রথম শাড়ি হতে পারে। আবার হতে পারে নিজের উপার্জনে কেনা প্রথম শাড়ি।

শাড়ি নিয়ে স্মৃতি যে শুধু নারীর থাকে তা নয়, একজন পুরুষের বেলায়ও থাকে নানান স্মৃতি। মায়ের পরা কোনো প্রিয় শাড়ি বা মাকে কিনে দেওয়া শাড়ি হতে পারে। হতে পারে স্ত্রী বা মেয়ের জন্য কেনা শাড়ি। ঈশিতা আজাদ শাড়ি নিয়ে এ ধরনের যে স্মৃতি, গল্প তাই ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইনস্টাগ্রামে হ্যাশট্যাগ শাড়ি মেমোরিতে শাড়ি পরা ছবি দিয়ে এ গল্প, কবিতা বা স্মৃতিটুকু লিখতে হবে। ইনস্টাগ্রামে #sareememory-র পাশাপাশি @saree_poem @longitudelatitude8 #LL8-এগুলোতেও ট্যাগ করতে হবে ছবি। এতে একসময় শাড়ি নিয়েই হাজার হাজার গল্পের ভান্ডার গড়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন

ঈশিতা ২০১০ সালে বাংলাদেশে আসেন। ঢাকায় ১০ বছর থেকে গত বছর আবার লন্ডনে থিতু হয়েছেন। জানালেন, বিদেশে থাকার সময়ও শাড়ি পরেছেন, আর বাংলাদেশে থাকার সময় প্রায় প্রতিদিনই শাড়ি পরে কাজে যেতেন। বলেন, কাজের চাপসহ বিভিন্ন চাপে বিষণ্ন থাকলেও কাজে বের হওয়ার আগে শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ মেলাতে মেলাতেই মনটা ভালো হয়ে যেত। আবার অনেক সময় মনের অবস্থাভেদেও শাড়ি পছন্দ করতেন। কমলা, লালসহ বিভিন্ন রঙের শাড়ি পরে একটা করে কবিতা লিখতে চেষ্টা করতেন। এভাবেই একসময় শাড়ি নিয়ে কিছু করার ভাবনাটা মাথায় আসে। তারপর অনলাইনে শিল্প, সাহিত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয় প্রকাশের প্ল্যাটফর্মে (#LL8) শাড়ির গল্প প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

default-image

ঈশিতা আজাদের মা শামীম আজাদ একজন দ্বিভাষিক কবি, লেখক ও গল্পকথক। ঈশিতা, তাঁর ভাই এবং মা সবাই যুক্তরাজ্যে বসবাসরত।

ইনস্টাগ্রামের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মায়ের সাদা সুতি পাড়বিহীন শাড়িটি নিজে পরেছেন ঈশিতা। শাড়ি নিয়ে তাঁর গল্পটাও লিখেছেন। তাঁর মা শামীম আজাদ বহু আগে ঈশিতা আর ঈশিতার ভাইকে নিয়ে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তবে এই শাড়ির স্মৃতিগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক। এই ধরনের শাড়ি পরে মা বিচিত্রা অফিস, ঢাকা কলেজ অথবা বাংলাদেশ টেলিভিশনে ছুটতেন। ঈশিতা লেখাটিতে উল্লেখ করেছেন, তাঁর মা সব সময় শাড়ি পরেই কাজে বের হতেন। কিন্তু দেখেশুনে শাড়ি কেনার মতো তেমন একটা সময় পেতেন না। তাই মা নানান রং এবং ডিজাইনের ১২ হাত কাপড় কিনে শাড়ি বানিয়ে পরতেন। ঈশিতা এ ছবিতে লিখেছেন, ‘শাড়ির প্রতি আমার এত ভালোবাসা আমার মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া/পেয়েছি। এটা আমার গল্প...।’

গল্পের পাশাপাশি ঈশিতা শাড়ির ছবিতে বাংলা ও ইংরেজিতে কবিতাও লিখেছেন। মাথায় গাঁদা ফুলের মালা আর সাদা শাড়ি পরা ছবিতে ঈশিতা লিখেছেন, ‘আমরা কিন্তু গাছের মতো। এই কংক্রিটের দালানেও শিকড় গজিয়ে যায়! জন্ম জন্মান্তরের দায়...মেয়ে তুমি স্বর্ণলতা নও!’...

ঈশিতা আজাদ বলেন, ‘আমি নিজেও শাড়ি পরা ছবি দিয়ে কবিতা লিখি। গল্পটাও লিখে রাখার চেষ্টা করতাম। তাই এখন কিছুটা আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে সবাই আমার আহ্বান সেভাবে বুঝতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। তাই এখন পর্যন্ত তেমন একটা সাড়া পাচ্ছি না। পুরুষের অনেকে ইনবক্সে শাড়ি নিয়ে স্মৃতির কথা জানালেও ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছেন না।’

default-image

হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় ঈশিতা আজাদের সঙ্গে। চলতি বছরের জুন মাসে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ঈশিতা আজাদ আর্ট ফান্ডরেইজিং অ্যান্ড ফিলানথ্রপি ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। ঈশিতা আজাদ প্রথম বাংলাদেশি, যিনি ব্রিটেনের শিল্প-সংস্কৃতি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আর্ট কাউন্সিল ইংল্যান্ডের সহায়তায় পরিচালিত এ ফেলোশিপ পান। ঈশিতা বেঙ্গল গ্রুপ, বিবিসি মিডিয়া ট্রাস্ট, ব্রিটিশ কাউন্সিল, এশিয়া ফাউন্ডেশন, ভি অ্যান্ড ইউ বিজনেস মিডিয়াতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া টেলিভিশন উপস্থাপক, নাট্য কর্মশালাসহ ব্রিটেন, বাংলাদেশে তিনি কবিতাবিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। তাঁর এসব দক্ষতা বিবেচনায় আর্ট ফান্ডরেইজিং অ্যান্ড ফিলানথ্রপি ফেলোশিপ লাভের গৌরব অর্জন করেন।

বিজ্ঞাপন

ঈশিতা আজাদ ইনস্টাগ্রামে শাড়ি পরা ছবি দিয়ে লিখেছেন: আচ্ছা, কেউ বলতে পারো, শৈশবের রং আর ঘ্রাণ কেমন ছিল? অথবা সেই তুমি থেকে সময়ের স্রোত বেয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতা পেরিয়ে আজকের তুমি হয়ে গড়ে ওঠার গল্পটা কেমন? আমি যদি বলি, চেনা গানের সুর যেমন আমাদের পুরোনো কোনো স্মৃতি বা ফেলে আসা সময়ে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনই, আমার নানুর টাঙ্গাইলের সেই নরম তাঁতের শাড়ির ঘ্রাণই আমার শৈশব! হ্যাঁ, বলতে পারো, তুমি তো নারী, তোমার অনুভূতিগুলো তাই এমন! কিন্তু আমার ধারণা, নারী বা পুরুষ, তুমি যে–ই হও, শাড়ির সঙ্গে আমাদের সবারই কমবেশি স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।... আমার মতো তোমাদেরও নিশ্চয়ই শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে অনেক না বলা গল্প আছে। হয়তো একটা সামান্য ছবিই তোমার হয়ে সেই গল্প বলে দেবে।

default-image

আর একটি ছবি দিয়ে ঈশিতা লিখেছেন, প্রতিমুহূর্তের শর্ত: এই যে বেঁচে থাকা, তার লবণাক্ত উপলব্ধি। রোমকূপ আর শিরাবাহিত স্বাদ ভালোবাসার, কষ্টের, অপরকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার। আমরা কি বুঝি? এই সাধের নধরকান্তি দুমুখো মোমবাতি?

শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতার জন্মভূমি ঐতিহাসিক গ্রিসে আবাসিক কবির সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশি কবি শামীম আজাদ। এথেন্সের সাহিত্যাঙ্গনের সংগঠন ‘আ পোয়েটস অ্যাগোরা রেসিডেন্সি’ তাঁকে ২০১৯ সালের জন্য আবাসিক কবি হিসেবে গ্রহণ করেছে। কবি শামীম আজাদ প্রথম কোনো বাংলাদেশি, যিনি ‘আ পোয়েটস অ্যাগোরা রেসিডেন্সি’র আবাসিকত্ব পান।

default-image

শামীম আজাদ ফেসবুকে শাড়ি নিয়ে ঈশিতা আজাদের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘অবাক হলাম শুনে ঈশিতা ইনস্টাগ্রামে ‘শাড়ি পোয়েম’ নামে বেশ কয়েক বছর নিজের পরা একেকটা শাড়ির সঙ্গে একটা করে ইংরেজি কবিতা লিখে যাচ্ছে! এবং তা ওর প্রজন্মের কাছে আদৃতও! আমার জীবন পাত করেছি দেশি ফ্যাশন, দেশি শাড়ি করে করে। কী করে যে নিজস্ব স্টাইলে ঈশিতা তার ধারা ধারাবাহিকতায় এটা করে যাচ্ছে! ভাবা যায়?’

মেয়ে ঈশিতার লেখা পড়ে ছেলে কিংবা মেয়ে যে–ই হোক, মা, বোন, ভাবি, মামি যারই হোক শাড়ির ছবি তুলে বা সংগ্রহ থেকে নিয়ে সঙ্গে স্মৃতিটুকু লিখে শাড়ি মেমোরিতে ট্যাগ করারও আহ্বান জানিয়েছেন শামীম আজাদ।

ঈশিতা আজাদ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নৃত্যশিল্পী আকরাম খানের আকরাম খান কোম্পানির বাংলাদেশ প্রকল্প পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ঈশিতার ইচ্ছা, শাড়ি মেমোরিকে একটি ট্রেন্ডে পরিণত করা। বলেন, ঈশিতার মাত্র দুই বা তিন বছর বয়সে তাঁর মা–বাবা একটি ডুরে শাড়ি কিনে দেন। সেটাই ছিল তাঁর প্রথম শাড়ি পরা।

default-image

বাংলাদেশে থাকার সময় ঈশিতার অনেক শাড়ি ছিল। লন্ডনে পাড়ি দেওয়ার আগে সেই শাড়িগুলো বিভিন্ন দামে বন্ধুবান্ধব ও অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেন। পরা শাড়িগুলো বিক্রি করে ৬০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। ১০ বছর ঈশিতার বাসায় সহকারীর দায়িত্ব পালন করা এবেনা ও শাহানাকে সেই টাকা ভাগ করে দেন, যা তাঁরা তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা খাতে খরচ করবেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0