যাঁরা অন্যের পণ্য ফেসবুকে বিক্রি করছেন, তাঁরা কিন্তু উদ্যোক্তা নন: আফসানা ফেরদৌসী
ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে তরুণেরা বাংলাদেশের পতাকা বহন করছেন, তাঁদেরই একজন আফসানা ফেরদৌসী। সম্প্রতি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নিয়েছেন ‘ফ্যাশনের অলিম্পিক’ খ্যাত ‘ওয়ার্ল্ডস্কিলস কম্পিটিশনে’।
প্রশ্ন :
অভিনন্দন। ‘ওয়ার্ল্ডস্কিলস কম্পিটিশন’ কী?
বিশ্বের ১৮৪টি দেশ ওয়ার্ল্ডস্কিলস কম্পিটিশনের সদস্য। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটিকে (এনএসডিএ) সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালে সরকারিভাবে এ প্রতিযোগিতার সদস্য হয় বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কাজানে এবং করোনার পর এ বছর ফিনল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে আমি ফ্যাশন টেকনোলজি বিভাগে বিশেষজ্ঞ ও বিচারক হিসেবে অংশ নিই। প্রথমবার দুটি আর পরের বার তিনটি বিভাগে প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেয় বাংলাদেশ।
প্রশ্ন :
আপনি তো এসডিসি (সোসাইটি অব ডায়ার্স অ্যান্ড কালারিস্ট) ইন্টারন্যাশনাল ডিজাইন কম্পিটিশনেও অংশ নিয়েছেন?
হ্যাঁ। ওখানে আমি ২০১১ সালে প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিই। সে বছর আমি আন্তর্জাতিকভাবে রানারআপ হই। ২০১৬ সালে আমি বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ও বিচারক হিসেবে অংশ নিই। ২০১৮ ও ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিচারক হিসেবে অংশ নিই।
প্রশ্ন :
বাংলাদেশের কান্ট্রি-কো-অর্ডিনেটর হিসেবে আপনার দায়িত্ব কী ছিল?
প্রাথমিকভাবে আমরা বাংলাদেশের ফ্যাশন স্কুলগুলোকে তালিকাবদ্ধ করি। সেগুলোতে মেইল করে এ আয়োজনে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানাই। নিয়মকানুন জানিয়ে দিই। প্রতিবছর একটা থিম ঠিক করে দিই। বিভিন্ন ফ্যাশন স্কুল থেকে প্রতিযোগীরা তাঁদের প্রকল্পের প্রেজেন্টেশন পাঠায়। এরপর সেগুলোকে শর্টলিস্ট করে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনপ্রক্রিয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এরপর আমরা একটি বিচারক কমিটি তৈরি করি। প্রোডাক্টের ফাইনাল সাবমিশন আর প্রেজেন্টেশনের পর বিজয়ী নির্বাচন করি। এরপর আমরা বিজয়ীকে গ্লুমিং করে ফুল ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠাই।
প্রশ্ন :
আপনি কাদের জন্য পোশাক ডিজাইন করেন?
নারী, পুরুষ, শিশু সবার জন্যই টেকসই পোশাক বানাই। আমি মূলত একজন অ্যাকটিভিস্ট। আমি প্রাণী অধিকার, টেকসই ফ্যাশন, বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী অধিকার—এগুলো নিয়ে কাজ করি। আমি আমার ডিজাইন আর তৈরিপোশাকের মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশ রক্ষার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। সচেতনতার বার্তা দিই। আফসানা ফেরদৌসী ব্র্যান্ডের মাধ্যমে আমরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই, যেখানে দাঁড়িয়ে সবাই অধিকার আর সচেতনতার কথা জানান দেবে। দেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘যাত্রা’তে আমার একটা কর্নার আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ তৈরিপোশাক খাতে ১১ বছর ধরে কাজ করছি সাসটেইনেবল ফ্যাশন ডিজাইনার এবং এক্সপার্ট হিসেবে।
প্রশ্ন :
ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব কেমন?
বিশ্ব ফ্যাশন তো ইউরোপকেন্দ্রিক। হুট করে বাংলাদেশের চোখে পড়ার মতো অংশগ্রহণ সেখানে থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে তারা আমাদের দেশীয় তাঁত, বিশেষ করে জামদানি আর নকশি কাঁথার বুননের কদর করে। তাদের কাছে শাড়ি নারীর অন্যতম ফ্যাশনেবল পোশাক। আমি যতবার ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক কোনো আসরে অংশ নিয়েছি, ততবার দেশীয় পোশাকে হাজির হয়েছি। আমি কী পরব, দেখার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করত তারা। আমার পরনের দেশীয় পোশাকগুলো অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে। একবার কাজাখস্তানের রাস্তায় শাড়ি পরে বেরিয়েছি, অনেকে এসে ছবি তুলল। ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক আসরে দেশি ফ্যাশনের ব্র্যান্ডিং আর অংশগ্রহণ নগণ্য। তবে ধীরে হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। প্রায়ই নামকরা দেশি মডেলরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় ফ্যাশনের আসরে অংশ নিচ্ছে।
প্রশ্ন :
দেশীয় ফ্যাশন কেমন এগোচ্ছে?
বাংলাদেশে এখন অনেক ফ্যাশন স্কুল হচ্ছে। আগে তো ফ্যাশন হাউসগুলোতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন চারুকলার। এখন ফ্যাশন স্কুলে পড়াশোনা করে ফ্যাশনের নিয়মকানুন ব্যবহার করে কাজটা করছেন। তাঁদের অনেকেই নিজেরা ব্র্যান্ড তৈরি করে সেগুলো দেশের গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন :
করোনাকালে তো ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের একটা উত্থান ঘটল। আপনি বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?
ব্যাপারটা একটু ট্রিকি। যাঁরা অন্যের পণ্য কম দামে কিনে ফেসবুকে বেশি দামে বিক্রি করছেন, তাঁরা কিন্তু উদ্যোক্তা নন। তাঁরা স্রেফ ব্যবসায়ী। যখন কেউ নতুন কোনো আইডিয়াকে পণ্য আকারে বাজারে আনবে, তিনি উদ্যোক্তা। সবকিছু এখন ফেসবুকে চলে এসেছে। মানুষ ইচ্ছামতো কপি পেস্ট করে, সেগুলোর পুনরুৎপাদন করছে। এতে করে ব্র্যান্ড ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়ছে। মনে করুন, একটা ব্র্যান্ডের একটা পণ্য, যেটির কাপড়, বুনন, ডিজাইন, রঙের সমাহার—সব সুন্দর। সেটি যখন দেখে পুনরুৎপাদন করা হলো, সেটির হাতের কাজ বা ডিজাইন সুন্দর। কিন্তু সেটি যে কাপড় বা কালার কম্বিনেশনে করা হয়েছে, সেটা ভালো নয়। কিন্তু ওই নকল পণ্যটির দাম স্বাভাবিকভাবেই কম। এরপর কেউ আর দাম দিয়ে আসল ভালো পণ্যটি কিনবেন না। বলবেন, ‘এখানে দাম বেশি। একই জিনিস আমি ফেসবুক থেকে কম দামে কেনার লিংক দিতে পারব।’ তাঁকে কে বোঝাবে যে দুটো পণ্য এক নয়! এভাবে ব্র্যান্ডের ক্ষতি হচ্ছে। ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে হ্যাঁ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফ্যাশন ব্যবসায়ীরা উপকৃত হয়েছেন। উদ্যোক্তারা দাম কম পেয়েছেন। তবে তাঁদের পণ্য সহজে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। যাঁরা পণ্যের কোয়ালিটি বোঝেন, কেবল তাঁদের কাছে ব্র্যান্ডের পণ্য গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।