ধূসর টি-শার্ট থেকে বিলাসবহুল ফ্যাশনে, মার্ক জাকারবার্গের বদলে যাওয়া স্টাইল

একসময় ধূসর টি-শার্ট আর হুডিই ছিল তাঁর পরিচয়ের অংশ। পোশাক নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না—প্রযুক্তি দুনিয়ায় এমন ভাবমূর্তিই তৈরি হয়েছিল মার্ক জাকারবার্গের। সেই জাকারবার্গ এখন বিরল সুইস ঘড়ি, নকশা করে বানানো টি-শার্ট আর বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রতি আগ্রহের কারণে আলোচনায়। প্রযুক্তি ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত স্টাইলেও এসেছে পরিবর্তন।

একসময় ধূসর টি-শার্ট আর হুডিই ছিল মার্ক জাকারবার্গের পরিচয়ের অংশ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ না করেই ২০০৪ সালে ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাকারবার্গ। তখন তিনি ছিলেন তরুণ এক উদ্যোক্তা। ২০১৭ সালে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই ফিরে গিয়ে সম্মানসূচক ডিগ্রি নেন এবং সমাবর্তনে বক্তব্য দেন।

বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে ঝুঁকি না নেওয়াই দিতে পারে ব্যর্থতার নিশ্চয়তা। নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও সেই সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গের জীবনযাপনে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে মেটার বড় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, অন্যদিকে তাঁর পোশাক ও ঘড়ির সংগ্রহে বিলাসবহুল পণ্যের উপস্থিতি। প্রযুক্তি দুনিয়ার পরিচিত এই উদ্যোক্তার স্টাইল তাই এখন ফ্যাশন সংবাদমাধ্যমেরও আগ্রহের বিষয়।

ঐতিহাসিক সম্পদ, শীর্ষ ধনীদের তালিকায় জাকারবার্গ

মেটা প্ল্যাটফর্মসের শেয়ার জাকারবার্গের সম্পদের বড় উৎস
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২৬ সালের অক্টোবরের ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্সে জাকারবার্গের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী, তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন। শেয়ারবাজারের ওঠানামার সঙ্গে তাঁর সম্পদের পরিমাণও প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ ডলারের বিনিময় মূল্য আনুমানিক ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ধরলে, ২৬১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৩২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। এটি তাঁর আনুমানিক সম্পদের হিসাব, হাতে থাকা নগদ অর্থ নয়।

মেটা প্ল্যাটফর্মসের শেয়ার তাঁর সম্পদের বড় উৎস। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার আয় আসে মূলত বিজ্ঞাপন থেকে। এআই প্রযুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আছে। তবে শেয়ারদর বাড়ার পেছনে কেবল এআইকেই দায়ী করা যায় না; প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যবসায়িক প্রত্যাশা ও বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতিও এতে প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুন

‘বাজে পোশাক’ নিয়ে ঠাট্টা থেকে ফ্যাশনে নতুন আগ্রহ

স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানের সঙ্গে মার্ক জাকারবার্গ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

একসময় জাকারবার্গের পোশাক বলতে অনেকের চোখে ভেসে উঠত একই ধরনের ধূসর টি-শার্ট ও গাঢ় রঙের হুডি। প্রতিদিন কী পরবেন, তা নিয়ে সময় নষ্ট না করতেই একই ধরনের পোশাক বেছে নেওয়ার কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। তাঁর এই অভ্যাস প্রযুক্তি দুনিয়ায় একধরনের পরিচিতি তৈরি করেছিল।

তবে সাধারণ পোশাক পরতেন বলেই তাঁর টি-শার্ট সস্তা ছিল, এমন নয়। বিলাসবহুল ইতালীয় ব্র্যান্ড ব্রুনেলো কুচিনেলির ধূসর টি-শার্ট পরতেও দেখা গেছে তাঁকে। ফলে তাঁর পোশাকের সরলতা আর পোশাকের দাম—দুটি বিষয় সব সময় এক ছিল না।

সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর পোশাকে এসেছে আরও বৈচিত্র্য। ঢিলেঢালা টি-শার্ট, নকশা করা পোশাক, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের তৈরি পোশাক এবং দুষ্প্রাপ্য ঘড়ির প্রতি আগ্রহের কারণে তাঁকে নিয়ে ফ্যাশনজগতে আলোচনা বাড়ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানকে সঙ্গে নিয়ে মিলান ফ্যাশন উইকে প্রাডার শোতেও উপস্থিত হন তিনি। এটি ছিল তাঁদের প্রথম মিলান ফ্যাশন উইকে অংশগ্রহণ।

পছন্দের বিলাসবহুল ব্র্যান্ড

জাকারবার্গের পোশাকের ধরনে এখন বিলাসবহুল ফ্যাশন ও স্ট্রিটওয়্যারের মিশেল দেখা যায়। তাঁর পছন্দের কিছু পোশাক ও ব্র্যান্ড নিয়ে ফ্যাশন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।

মাইক আমিরির নকশার টি-শার্ট

টি–শার্টে জাকারবার্গের নিজস্ব স্লোগান
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

মার্কিন ফ্যাশন ডিজাইনার মাইক আমিরির প্রতিষ্ঠিত আমিরি ব্র্যান্ডের পোশাকের প্রতি জাকারবার্গের আগ্রহ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর জন্য তৈরি ঢিলেঢালা ও বক্সি কাটের টি-শার্টও নজর কেড়েছে। কিছু টি-শার্টে আছে ব্যক্তিগত স্লোগান। যেমন ‘বিল্ডিং ইজ মাই লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ’, অর্থাৎ কিছু তৈরি করাই যেন তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা।

আরেকটি আলোচিত স্লোগান ‘আউট জাক, আউট নিহিল (Aut Zuck, aut nihil)’। এটি লাতিন ‘আউট সিজার আউট নিহিল’ কথাটির অনুকরণ, যার অর্থ ‘সিজার হও, নয়তো কিছুই নয়’। এখানে ‘সিজার’-এর জায়গায় ‘জাক’ ব্যবহার করে নিজের নামের সঙ্গে স্লোগানটি মিলিয়েছেন তিনি। তবে এসব টি-শার্টের প্রতিটিই একটিমাত্র তৈরি হয়েছে কিংবা কেবল তাঁর জন্যই বানানো—এমন দাবি থাকলেও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কোয়ায়েট লাক্সারি ও স্ট্রিটওয়্যার

কোয়ায়েট লাক্সারি বলতে এমন পোশাককে বোঝায়, যাতে বড় লোগো বা চোখে পড়ার মতো নকশার বদলে কাপড়ের মান, কাট ও নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাকারবার্গের সাম্প্রতিক পোশাকেও এ ধরনের সরল নকশা ও আরামদায়ক কাট দেখা যায়। ছুটির দিনের পোশাকে ঢিলেঢালা শর্টস, স্লাইড স্যান্ডেল ও সাধারণ টি-শার্টের মতো অনানুষ্ঠানিক উপকরণও তাঁর স্টাইলের অংশ।

তবে তাঁর পোশাকের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্র্যান্ডের নাম ও সেসবের উৎপাদনস্থল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে যাচাই করা যায়নি।

মিলান ফ্যাশন উইকে প্রাডা

প্রিসিলা চ্যাক ও মার্ক জাকারবার্গ—দুজনেরই পরনে প্রাডার পোশাক
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মিলানে প্রাডার অটাম-উইন্টার ২০২৬–২৭ সংগ্রহের প্রদর্শনীতে স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানকে সঙ্গে নিয়ে সামনের সারিতে বসেছিলেন জাকারবার্গ। দুজনেরই পরনে ছিল প্রাডার পোশাক। প্রযুক্তি ও ফ্যাশনজগতের সম্পর্ক নিয়ে তখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়, বিশেষ করে মেটার স্মার্ট চশমা ও বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সম্ভাব্য সহযোগিতার প্রসঙ্গে। তবে প্রাডার সঙ্গে মেটার কোনো নির্দিষ্ট স্মার্ট চশমা প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে, এমন দাবি থাকলেও সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

অভিজাত ঘড়ির সংগ্রহ

জাকারবার্গের কবজিতে বুলগারির দামি ও সবচেয়ে পাতলা ঘড়ি
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিলাসবহুল ঘড়ির প্রতিও জাকারবার্গের আগ্রহ আছে। একসময় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত জাকারবার্গকে এখন বিরল ও দামি ঘড়ি পরতেও দেখা যায়।

তাঁর সংগ্রহে থাকা ঘড়ির মধ্যে সুইস নির্মাতা গ্রুবেল ফরসের ‘হ্যান্ড মেড ১’ বিশেষভাবে আলোচিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেটার নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত এক ভিডিওতে এই ঘড়ি পরেছিলেন তিনি। এর দাম প্রায় ৯ লাখ মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছিল ব্লুমবার্গ। ঘড়িটি হাতে তৈরি করতে প্রায় ৬ হাজার ঘণ্টা সময় লাগে বলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।

জাকারবার্গকে ডি বেথুন, এফ পি জর্নে ও পাটেক ফিলিপের মতো নির্মাতার ঘড়ি পরতেও দেখা গেছে। এসব ঘড়ির কিছু মডেল সীমিত সংখ্যায় তৈরি হয় এবং সেসবের দাম কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে ঘড়ির মডেল, সংস্করণ, অবস্থা ও বাজারদরের ওপর মূল্য নির্ভর করে; তাই তাঁর সংগ্রহের প্রতিটি ঘড়ির নির্দিষ্ট দাম নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

আরও পড়ুন

পরিবারকে সময় দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ

ব্যবসা ও জনসমক্ষে উপস্থিতির বাইরে পরিবারও জাকারবার্গের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

ব্যবসা ও জনসমক্ষে উপস্থিতির বাইরে পরিবারও জাকারবার্গের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানের সঙ্গে তাঁর তিন মেয়ে—ম্যাক্সিমা, আগস্ট ও অরেলিয়া। তাঁদের জন্ম যথাক্রমে ২০১৫, ২০১৭ ও ২০২৩ সালে। সে হিসাবে ২০২৬ সালে মেয়েদের বয়স আনুমানিক ১০–১১, ৮–৯ ও ২–৩ বছর।

জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবি ভাগ করে নেন
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবি ভাগ করে নেন। কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পারিবারিক জীবনও তাঁর জনসমক্ষে প্রকাশিত ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ।

প্রযুক্তির দুনিয়া থেকে ফ্যাশনের আলোচনায়

হ্যালোইনের পোশাকে জাকারবার্গ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

মেটা যখন স্মার্ট চশমা ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির মতো পণ্যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর ব্যক্তিগত স্টাইলও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসছে। তবে জাকারবার্গের পোশাকের পরিবর্তনকে কেবল মেটার ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ফল বলা যাবে না। তাঁর ব্যক্তিগত রুচি, পোশাক নিয়ে আগ্রহ এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির ধরনও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ধূসর টি-শার্ট ও হুডির জন্য পরিচিত জাকারবার্গ এখন বিলাসবহুল ঘড়ি, নকশা করা টি-শার্ট এবং ফ্যাশন শোর সামনের সারিতেও আলোচনায়। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর পরিচিতির পাশাপাশি এই পরিবর্তন তাঁকে ফ্যাশনসংক্রান্ত আলোচনারও একটি পরিচিত মুখ করে তুলেছে।

সূত্র: হার্ভার্ড গেজেট, ব্লুমবার্গ, জিকিউ, আনসা ও নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন