কী দেখে রাজশাহী অঞ্চলের নকশিকাঁথা আলাদা করা যায়, জানেন?

রাজশাহী অঞ্চলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথায় খুঁজে পাওয়া যায় আরাম ও মমতা। কাঁথার পাশাপাশি পোশাকের ওপরও দেখা যাচ্ছে নকশির নকশা। তবে এই অঞ্চলের নকশিকাঁথায় একটি বিশেষত্ব আছে। কী সেটি?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘ক্রস স্টিচ’ নকশিকাঁথাকে স্থানীয়ভাবে বলে কার্পেট সেলাই
ছবি: প্রথম আলো

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘ক্রস স্টিচ’ নকশিকাঁথাকে স্থানীয়ভাবে বলে কার্পেট সেলাই। এটা দেশের আর কোথাও হয় না। এই সেলাইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি খুলে আসার কোনো সুযোগ নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রানীহাটি এলাকার ‘নকশিঘর’ নামের প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৫ বছর ধরে এই নকশিকাঁথা তৈরি করছে। তাদের চেইন সেলাই ও কড়ি সেলাই জনপ্রিয়।

নকশিকাঁথার অনন্য দিক হচ্ছে, একজন নারীর নকশিকাঁথার নকশা আরেকজনের সঙ্গে কখনোই পুরোপুরি মেলে না। ব্যক্তিগত অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আর কল্পনার ভিন্নতায় লুকিয়ে আছে এই শিল্পের মূল শক্তি।

তাই সব বাড়ির নকশিকাঁথা নির্দিষ্ট কোনো ছক মেনে নয়; বরং তা হয়ে ওঠে সেলাই করতে করতে, ভাবনা থেকে ভাবনায় এগিয়ে গিয়ে। এখন অবশ্য অনলাইন থেকে ফুল-পাতাসহ বিভিন্ন মোটিফ নিয়েও নকশিকাঁথায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
আলপনা থেকে অনুপ্রাণিত রাজশাহীর নকশিকাঁথা
ছবি: আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়ালাভাঙ্গা এলাকায় ৯ বছর ধরে ‘মায়া নকশীকাঁথা ঘর’ চালাচ্ছেন মাসুম রেজা। বললেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রাচীনকাল থেকে ঘরে ঘরে নকশিকাঁথা সেলাই শুরু হয়েছে। এখন এটা বাণিজ্যিকভাবে হচ্ছে। তাঁদের নয়নমণি, সুজনী, চেইন কাঁথা, কার্পেট কাঁথা, বকুল কাঁথা, বাগানবিলাস প্রসিদ্ধ।

রাজশাহীর কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়ায় শতাধিক নারীকে নিয়ে নকশিকাঁথা তৈরি করেন মাহালী সম্প্রদায়ের মেয়ে সুমী মুর্মু। ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’ নামের একটি সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। এখানে তৈরি নকশিকাঁথা বিক্রি করে অর্জিত আয়ের একটি অংশ নারীদের দেন সুমী।

সুমী মুর্মু জানান, আগে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বাহারি ফুল ও নকশা নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তুলতেন। এখন অনলাইনে নকশিকাঁথার অনেক নকশা পাওয়া যায়। সেখান থেকে বর্তমানে ৩০০ ধরনের নকশার নকশিকাঁথা তৈরি করছেন। ফলে নকশিকাঁথায় আরও বেশি নতুনত্ব এসেছে। তাঁদের নকশিকাঁথা ৮০০ থেকে ৮ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন
শাড়িতে নকশি ফোঁড়ের আদলে করা নকশা
শাড়ি: অ্যাপোনিয়া, ব্লাউজ: যাত্রা মেলা

পদ্ম, শাপলা, গোলাপ কিংবা জুঁইয়ের নকশাই বেশি চোখে পড়ে। অনেক কাঁথার মধ্যে থাকে বড় একটি পদ্মফুলের নকশা, চারদিকে ছড়িয়ে থাকে লতাপাতা আর ছোট ছোট ফুল। এতে কাঁথাজুড়ে তৈরি হয় একধরনের ছন্দময় ভারসাম্য।

ফুলের পাশাপাশি নকশিকাঁথায় জ্যামিতিক নকশার উপস্থিতিও চোখে পড়ে। বৃত্ত, চতুর্ভুজ কিংবা তারকা আকৃতির নকশা কাঁথাকে দেয় শৈল্পিক কাঠামো। এই নকশাগুলো অনেক সময় আলপনা থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে রেখার সরলতায় ফুটে ওঠে সৌন্দর্য।

প্রাণী ও পাখির নকশারও চল রয়েছে। তার মধ্যে ময়ূরের পেখম, মাছের চলন কিংবা পাখির যুগল চিত্র গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ককে তুলে ধরে নকশিকাঁথায়।

আরও পড়ুন