ঈদের শাড়ি

উৎসব আর উপলক্ষে, পালা আর পার্বণে বাঙালি নারীদের শাড়ি একান্ত সঙ্গী। নানা পোশাকের উপস্থিতি, পরার সুবিধা শাড়িকে কিছু পেছনে ফেললেও এর আবেদন কমেনি এখনো। বরং পরিধানরীতিতে নতুন মাত্রা শাড়িকে দিয়েছে নতুনতর লুক। তারুণ্যের আগ্রহ অতএব জাগাচ্ছে আশা। এমনকি এই ঈদেও।

আড়ংয়ের ঈদ সংগ্রহের শাড়িছবি: আড়ংয়ের ফেসবুক পেজ

বাঙালি নারীর সব সময়েরই প্রিয় পরিধেয় শাড়ি। সময়ের পরিবর্তনে পরিধেয়টি প্রধান থেকে অন্যতমে জায়গা পেয়েছে। বাঙালির শাড়ি পরার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। এমনকি পৃথিবীর যে কয়টি জাতিগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে তাদের প্রাচীন পোশাক এবং এর ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে, বাঙালি এবং তার শাড়ি সেগুলোর মধ্যে একটি।  

ছবি: এবারের ঈদে লা রিভের শাড়ি সংগ্রহ
ছবি: লা রিভ

নব্বই দশকের শুরুর দিকে বাঙালির পোশাক–ভাবনায় যোগ হয় দেশীয় ফ্যাশনের পোশাক। যেখানে প্রচলিত পোশাকের উপস্থাপন হয় ভিন্ন আয়োজনে। একই দশকের শেষের দিকে ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবগুলোতে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর পোশাক জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। পোশাকে ডিজাইনারদের ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। কাপড়ের বুনন ও নকশায় তৈরি হয় বৈচিত্র্য। রঙের ব্যবহারে আসে নতুনত্ব। সুতরাং বাঙালি তাদের বহুল প্রচলিত পোশাকগুলো আবিষ্কার করে নতুন আঙ্গিকে।

বৃষ্টি ও কাঠফাটা রোদ নিয়ে এ সময়ের আবহাওয়া যেন কনট্রাস্ট নেচারে রূপ নিয়েছে। বিরূপ হলেও এই দুই ঋতুর মেলবন্ধন দেখা যাবে ঈদের পোশাকে। ডিজাইনাররাও উৎসব এবং আবহাওয়াকে মাথায় রেখেই তৈরি করেছে তাদের কালেকশন। আর ফ্যাশন সচেতনরাও চান উৎসবের সময় নিজেদের সাধ্য এবং সাধের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পোশাকটি। এ ক্ষেত্রে মেয়েরাই এগিয়ে। মেয়েদের পোশাকের কথা ভাবলেই প্রথমে চলে আসে শাড়ি। আর শাড়ি বরাবরই বৈচিত্র্যপূর্ণ পোশাক।

কে ক্রাফটের ঈদ সংগ্রহের শাড়ি
ছবি: কে ক্রাফট

গরমে সুতি শাড়ি মানেই আরাম। ঈদে দিনের বেলায় যেমন সুতি শাড়ি দেখা যাবে, তেমনি রাতের পার্টিতে দেখা মিলবে সিল্ক, জর্জেটের বাহার। সুতির ক্ষেত্রে তাঁতের শাড়িই সবার আগে। এখন এ ধরনের শাড়িতেও দেখা যায় বৈচিত্র্য। যেমন হাতের কাজ, মেশিনের কাজ, কখনো স্ক্রিন বা ব্লক প্রিন্ট, কখনো হ্যান্ড পেইন্ট। এমনকি ফ্লোরাল ও জিওমেট্রিক প্যাটার্নও দেখা যাবে শাড়ির জমিনে।

শাড়িতে মসলিনের কদর বেড়েছে। রাতের শাড়িতে মসলিন প্রাধান্য পেতে পারে। শাড়িতে এমব্রয়ডারি, পাড়ে বসানো বড় প্লিট, কখনো আর্টিফিশিয়াল ফেদার, কাটওয়ার্ক, পুঁতি ও জরির কাজ, অ্যাপ্লিকে। সিল্কের শাড়িতে হাতের কাজ বেশি দেখা যাবে। তার মধ্যে মেশিন ও হাতের এমব্রয়ডারিই বেশি থাকবে। আবার কনট্রাস্ট ফ্যাব্রিকের শাড়িও রয়েছে ট্রেন্ডে। রয়েছে অর্ধেক সিল্ক এবং অর্ধেক মসলিন শাড়ি। জর্জেটের শাড়িতে ফ্লোরাল প্রিন্ট, তার মধ্যে হালকা অ্যাম্বেলিশমেন্ট দেখা মিলবে।

ঈদের সংগ্রহে বৈচিত্র্য আছে অঞ্জন’সের শাড়িতে
ছবি: অঞ্জন’স

আবহাওয়ায় গ্রীষ্মের প্রভাব বেশি থাকলেও রাতের পার্টিতে শাড়ির সঙ্গে পরে নিতে পারেন জ্যাকেট। তবে সেটি হতে হবে হালকা ওজনের কাপড়ে তৈরি। আর যাঁরা জ্যাকেট এড়িয়ে চলতে চান, তাঁরা চাইলে ট্রেন্ডি লুকের জন্য বেল্ট ব্যবহার করতে পারেন। সেটা হতে পারে লেসের, মেটাল বা কাপড়ের। সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে বিভিন্ন রকমের বাকলস।

স্বস্তির কথা মাথায় রেখে সুতি, খাদি, লিনেন, এন্ডি সুতির প্রাধান্য বেশি দেখা যাবে। তার পাশাপাশি সিল্ক, এন্ডি সিল্ক, মসলিন, শিফন, জর্জেটের প্রাধান্য দেখা যাবে। কাপড়ের বুননে দেখা যাবে ভিন্নতা। মসৃণ কাপড়ের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম জেকার্ড কাপড়ের দেখা মিলবে, সঙ্গে আছে বিভিন্ন রকমের প্রিন্টের বাহার। রঙের ক্ষেত্রে স্নিগ্ধতা যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে বাহারি রঙের ব্যবহার বা কনট্রাস্ট। তবে সাদা, হালকা রঙের শেড, লাল, কমলা, বেগুনি, অ্যাশ, ম্যাজেন্টা, গোলাপি ইত্যাদি রঙের শেডও চোখে পড়বে।

এই শাড়ি সাদা কালোর এবারের ঈদ সংগ্রহের
ছবি: সাদা কালোর ফেসবুক পেজ

এখন শাড়ি পরার ক্ষেত্রেও এসেছে নতুনত্ব। আগের মতো ট্র্যাডিশনালা ব্লাউজ দিয়ে শাড়ি না পরে অনেকেই, বিশেষ করে তরুণীরা ক্রপটড, শার্ট, টপ, টি-শার্টকে শাড়ির চমৎকার সঙ্গী করেছেন। তাতে বেশ একটা ট্রেন্ডি লুক যেমন এসেছে, তেমনি উচ্ছলতাও প্রকাশ পায়। পরার মুনশিয়ানায় খুব সাধারণ শাড়িও অসাধারণ হয়ে ওঠে। শাড়ি পরার চল কমেছে। তাই নিরীক্ষাধর্মী পরিধানরীতি শাড়ির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। কম বয়সীরা সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, স্কার্ট-টপস, প্যান্টস-শার্ট, টি-শার্টের স্বাচ্ছন্দ্য মেনে নিয়েও শাড়ির প্রতি আগ্রহী হচ্ছে এবং পরছে।

বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস, যেমন শাড়ি করেছে বিভিন্ন ডিজাইন এবং থিমে তেমনি ডিজাইনাররা করছেনে বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষাধর্মী শাড়ি। ফলে এবার ঈদে স্পষ্ট শাড়ির বৈচিত্র্য। আর এটা বেশ আশা জাগানো। এমনকি তাঁতের শাড়িতেই দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন ডিজাইন। ফলে শাড়ি নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটছে না।

কিউরিয়াসের ঈদের শাড়ি; বেল্ট হতে পারে সঙ্গী
ছবি: কিউরিয়াসের ফেসবুক পেজ

বরং শাড়ি নিয়ে এই উচ্ছ্বাস সত্যিই শাড়ির ভবিষ্যৎকে আরও সুগম করে। নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে। ঈদে সবাই শাড়ি কিনেও থাকেন নিজে পরার জন্য কিংবা উপহার দেওয়ার জন্য। আর এর মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে ভোক্তারা আন্তরিক পৃষ্ঠপোষণা দিয়ে থাকে শাড়িকে। এভাবে করে টিকে থাকছেন এই শিল্প ও শিল্পীরা।