যেকোনো উৎসবের পোশাকি ট্রেন্ডে আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে, থাকবেও। কিন্তু শুধু এই ট্রেডিশনাল সোর্স আর এলিমেন্টস দিয়ে এ ঈদে কোনো আন্তর্জাতিক মানের ট্রেন্ড সৃষ্টি হয়নি; বরং নিজেদের কিছু ট্রেন্ডে নিজেরাই সাবকন্টিনেন্টের একটা স্ট্যান্ডার্ড ধরে রেখেছি। কারণ, ফ্যাশন ডিজাইন ও মার্কেটিংয়ে সময়ের ধারায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনুসারী যেমন হতে হয়, অন্যদিকে ক্রেতার মনোভবের ওপরও নির্ভর করতে হয়।
ঈদে বাংলাদেশের রং
ঈদে বাংলাদেশের পোশাকের কোনো নির্দিষ্ট রং কোনো সময়ই দেখা যায়নি। এবারও থেকে গেল সেই অবিকল ধারা। জাতিগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা কখনোই এক জায়গায় স্থির নই। আমাদের কেউ ডানে গেলে বাঁয়ে-পেছনে-সামনে আরও দল মার্চপাস্ট করে। তাই ঈদে নির্দিষ্ট রং অকল্পনীয়। এবারের কালেকশনে অন্যবারের মতোই বাহারি সালোয়ার-কামিজ আছে, ক্যাজুয়ালে পশ্চিমা ও সাবকন্টিনেন্ট ব্লেন্ড। ছেলেদের পাঞ্জাবির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাই হরেক রকম রংই আমাদের ঈদ ট্রেন্ড।
ঈদে উপমহাদেশের প্যাটার্ন
উপমহাদেশের প্যাটার্নকে কী বলব? আমাদের সংস্কৃতি? বলা কিন্তু যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এই যে সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি—এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের শিকড়ের পোশাক কিন্তু নয়। বাঙালির নিজস্ব কুর্তি-ধুতি-পায়জামা-শাড়ি এখন কমই আছে। তবে আমাদের ধর্মীয় আর সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখন পরিস্থিতি এমন যে পাঞ্জাবি বা সালোয়ার-কামিজও আমাদের পোশাকের পরিণত হয়ে গেছে। আর ঈদ যেহেতু মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তাই এই পোশাকি প্যাটার্নই আমাদের সব সময়ের ঈদ ট্রেন্ড; যার সাবকন্টিনেন্টাল আইডেনটিটি আছে, মুসলিম বিশ্বেও কানেক্ট করা যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরাসরি কোনো অবস্থান নেই। তাই এখানে নতুন কোনো ট্রেন্ড তৈরি হয়নি।
ফোক অর্নামেন্টেশনই চলছে, চলবে
বিশ্বব্যাপী যে ফোক ইন্সপায়ার্ড কোটের রমরমা, তার কিছু অংশে আমাদের এখানেও মিল রয়েছে। কারণ, লোকজ এসব মোটিফ আর ডিজাইন আমাদের শিকড়ের মতোই; যদিও উপমহাদেশে এর অনেক কিছুই পাকিস্তান আর ভারতের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। বিশেষ করে মেয়েদের সব ট্র্যাডিশনাল ড্রেস আর ছেলেদের পাঞ্জাবি ও কটিতে তা দৃশ্যমান।
এক্সেসরিজে আভিজাত্যের প্রশ্ন
পশ্চিমা ব্যাগ-জুতা বাদেও আমাদের বিরাট একাংশে রয়েছে নিজেদের এক্সেসরিজ। এ দেশে উৎসব চলবে, আর মেয়েরা শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে দুল-চুড়ি-হারের মতো অনুষঙ্গ পরবে না, তা কি হয়! এটি এ উপমহাদেশে পরিবর্তনশীল। কিন্তু বহির্বিশ্বের সঙ্গে এর মিল নেই। আর এবারের ঈদে এক্সেসরিজের নতুন কোনো ট্রেন্ড হয়নি; বরং কয়েক বছরের মতোই মেটালের একটা অভিজাত মার্কেট আছে, ডিজাইনে ডিটেইল টাচ আছে। ডিজাইনে ডিটেইল টাচ বলছে, অল্পের মধ্যে যত কারুকার্য করা যায়। অন্যদিকে, মেয়েদের বটুয়ার মতো হ্যান্ডব্যাগে আমাদের উপমহাদেশের প্রভাব মেলে। তবে পুরোপুরি বাংলাদেশের তা কিন্তু বলার উপায় নেই। সব মিলিয়ে এক্সেসরিজে আমাদের ট্রেন্ড আমাদের মতো করেই হয়। কারণ, মূল বিষয় আভিজাত্য।
২০২১ সালের ঈদ ট্রেন্ডে বাংলাদেশ দিয়ে কোনো পাঞ্চ কালেকশন হয়নি, যা দিয়ে আমরা ঈদ ট্রেন্ড নিজেদের মৌলিক উৎস আর উপাদান দিয়ে সাজাব। আমাদের নিজস্বতা আসলে বরাবরের মতোই ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে ব্লেন্ড হয়ে আছে। এটিই আসলে আমাদের চল। সব মিলিয়ে বলা যায়, নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সামনে রেখে উপমহাদেশের তালে তাল মিলিয়ে কিছু কিছু ট্রেন্ড আমাদের গণ্ডিতে জন্মায়, এখানেই ঘোরাঘুরি করে, এখানেই বিলীন হয়ে যায়। তাও খারাপ কী, যদি প্রোডাক্ট হয় মেড ইন বাংলাদেশ।