গবেষণার জন্য কোটি টাকার তহবিল পেয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
প্রকৌশল-গবেষণায় একটু ভিন্নভাবে এগোনোর চেষ্টা করছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। কীভাবে? জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের ডিন অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন
অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গবেষণা কম হয়—এ কথা বললে ভুল হবে। তবে আমার মনে হয়, আমাদের গবেষণা যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারছে না। আমরা যখন বলি চীন বা যুক্তরাষ্ট্র প্রকৌশল খাতে খুব ভালো গবেষণা করছে—এ কথার অর্থ কী? অর্থ হলো তাদের গবেষণার ব্যবহারিক প্রয়োগ চোখে পড়ছে। তারা যে শুধু কাগজে-কলমে গবেষণা করছে, তা নয়। সেই গবেষণা কাজে লাগিয়েই হয়তো কোনো এআই টুল তৈরি করছে, রোবট বানাচ্ছে, মহাকাশে মানুষ পাঠাচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ তাদের ওখানে আছে।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে তাহলে ঘাটতিটা কোথায়? কেন আমাদের গবেষণার প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ছে না? হ্যাঁ, আমাদের দেশেও গবেষণা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের আগ্রহ শুধু প্রকাশনায়। আমাদের অধিকাংশ গবেষণাই তত্ত্বীয় (থিওরিটিক্যাল)। ব্যবহারিক গবেষণা যদি হয়ও, সেটা বাণিজ্যিকীকরণ বা পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছায় খুব কম।
কেন? অনেকগুলো কারণের একটি হলো—ঐতিহাসিকভাবেই উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা আমাদের মধ্যে কম। আমাদের বাপ-দাদাদের কথাই ধরুন। একসময় তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষিজীবী। পরে একটা পর্যায়ে এসে শুরু হলো চাকরির প্রতি ঝোঁক। যেমন আমাদের সময় যাঁরা ভালো ছাত্র ছিল—তাদের নিয়ে মা-বাবা স্বপ্ন দেখতেন, ছেলে ডাক্তার হবে, নয়তো প্রকৌশলী হবে। ‘ব্যবসায়ী’ হবে, এমনটা কিন্তু কেউ ভাবতেন না। সমাজও এই ভাবনাকে উৎসাহ দেয় না।
ফলে গোড়াতেই স্টার্টআপের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়ি। স্টার্টআপ মানে কিন্তু কেবল ব্যবসা শুরু করা নয়, বরং নতুন একটা উদ্যোগ নেওয়া। নতুন উদ্যোগ আসবে কোথা থেকে? নতুন উদ্ভাবন থেকে। গবেষণাই নতুন উদ্ভাবনের জন্ম দেয়। কিন্তু উদ্ভাবনকে কি আমরা উদ্যোগে রূপ দিতে পারছি?
একটা উদাহরণ দিই। আমার বুয়েটের এক সহপাঠী দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি করেছে। তার পিএইচডির বিষয় ছিল—কীভাবে সফটওয়্যারের ত্রুটি (বাগ) শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধন করা যায়। খোদ মার্কিন গবেষকদেরও ধারণা ছিল, এর শতভাগ সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু আমার বন্ধু সেটা করে দেখিয়েছে।
ফলে তার কাজটা প্রশংসা পেয়েছে, সে একটা স্টার্টআপও দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। এখন বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ওর সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এই যে একাডেমিক গবেষণার বাস্তবিক প্রয়োগ, উদ্যোগে রূপান্তর—এটাই আমাদের দেশে হচ্ছে না। কারণ, সেই সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
জাপান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কই আমাদের প্রায় ১ কোটি টাকা দিয়েছে একটি গবেষণার জন্য। এআই ব্যবহার করে ঢাকার ট্রাফিক ও যানবাহন ব্যবস্থা কীভাবে উন্নত করা যায়, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ ছাড়া গুগলের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। ওরা ক্যাম্পাসে একটা ল্যাব স্থাপন করে দেবে, যেটাকে বলা হচ্ছে সাইবার সিকিউরিটি ক্লিনিক। বাংলাদেশের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক হয়েও আমরা নর্থ সাউথে একটা ইনোভেশন হাব করছি। এমন আরও নানা উদ্যোগ চলমান আছে।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি পেতে হলে শিক্ষকদের গবেষণা করতে হয়; কিন্তু সেই গবেষণা শুধু প্রকাশ করতে পারলেই হলো। আবার একজন শিক্ষক যে সমাজের নানা স্তরে ঘুরে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে একটা সমস্যাকে বুঝবেন, গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করবেন, সে সুযোগই বা কোথায়? তহবিল (ফান্ড) পাওয়াও এখানে বেশ কঠিন। অথচ ভালো গবেষণার পূর্বশর্তই হলো ভালো অঙ্কের অর্থ।
সরকারি সহায়তা সেভাবে মেলে না। বিদেশে যেমন টেসলা, ফোর্ড, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণায় বিনিয়োগ করছে, সমস্যার সমাধানের খোঁজে তারা গবেষকদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখনো সেই চর্চা গড়ে ওঠেনি। কারণ, গবেষণার কোনো চাক্ষুষ লাভ তাদের চোখে পড়েনি। যদি লাভ না হয়, তাহলে একটা কোম্পানি আপনাকে কেন টাকা দেবে?
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে এই চক্র থেকেই আমরা বেরোতে চেষ্টা করছি। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তহবিল নিয়ে আমরা গবেষণা করছি, সমস্যার সমাধান করছি।
পাঁচ বছর ধরে বেসরকারি খাত থেকে ফান্ডিং নিয়ে গবেষণা করছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মেশিন ইন্টেলিজেন্স ল্যাব। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসছে সমাধানের খোঁজে। বাংলাদেশে এমন প্রতিষ্ঠান সত্যি বলতে সংখ্যায় কম।
তবে বিদেশি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানিও আমাদের গবেষণায় ফান্ডিং দিচ্ছে। জানিয়ে রাখি, গত বছর শুধু মেশিন ইন্টেলিজেন্স ল্যাবই ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূল্যমানের কাজ করেছে।
এখন দেখুন, এআইসংক্রান্ত কাজে একটি মডেলকে প্রশিক্ষণ (ট্রেইনিং) দিতে গেলে যে জিপিইউ বা সার্ভার প্রয়োজন, সেটা আমার কাছে নেই। ফলে গবেষকদের ক্লাউড ব্যবহার করে কাজ করতে হয়। আমাদের গবেষকেরা রানপড নামে একটি ক্লাউড ব্যবহার করেন। গত বছর শুধু এই রানপডের বিলই এসেছে প্রায় ৬০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ ৭৩ লাখ টাকার বেশি। আমরা এই টাকা পেয়েছি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই একটি গবেষণায় এত টাকার তহবিল বরাদ্দ করা সম্ভব নয়। তাহলে ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কেন আমাদের এত টাকা দিচ্ছে?
কারণ, আমরা ওদের সমস্যা সমাধান করছি। আমাদের গবেষকেরা এসব গবেষণা উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন দেশের সম্মেলনে যাচ্ছেন, আবার গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্যও খরচ হচ্ছে—সবই আসছে সেই বেসরকারি ফান্ডিং থেকে।
আমরা বিশ্বাস করি, যদি সত্যিকার অর্থেই গবেষণার বাস্তবিক প্রয়োগ আরও বেশি দৃশ্যমান হয়, তাহলে দেশে গবেষণার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা সম্ভব। এমন আরও গবেষণা করা সম্ভব, যা সমাজে প্রভাব ফেলবে।