default-image

রাস্তায় হাজারো অসহায় মানুষ

রাতভর ভারী বৃষ্টি, ঝড়ে ঘরে পানিবন্দী ছিলেন হাজারো মানুষ। শেষরাতে বৃষ্টির সঙ্গে উপর্যুপরি বজ্রপাত মানুষের ভয়, আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। অন্ধকারের কারণে মানুষজন ঘর থেকে বের হতে পারছিলেন না। তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো রাস্তায় তখন বুকসমান পানি। কোথাও তার চেয়ে বেশি। সঙ্গে প্রবল স্রোত। ধীরে ধীরে অন্ধকার কাটে। সকাল হয়। ১৭ জুনের সেই সকালটা কখনো ভুলতে পারবেন না মোহাম্মদ আম্মার। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। কেউ সাঁতরে, কেউ বুকসমান পানি ভেঙে যে যে দিকে পারছেন ছুটছেন আশ্রয়ের খোঁজে। নারী–শিশুরা ছিলেন আরও অসহায়। চারদিকে মানুষের আকুতি। মোহাম্মদ আম্মার জানান, তিনি এমনও ব্যক্তিকে দেখেছেন, তাঁর কোটি টাকা আছে, গাড়ি আছে কিন্তু সেদিন সকালে স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে অসহায়ের মতো রাস্তায় বুকপানি ভেঙে আশ্রয় খুঁজছিলেন। একজন সরকারি চাকরিজীবীর পরিবারকে নৌকায় তোলার পর শোনেন সারা রাত ঘরের ভেতর সবাই পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু নৌকা বের হয় শহরে। অনেকেই সহযোগিতায় নামেন।

দেশে-বিদেশে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা

নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, রাত থেকে নৌকা ঠেলে ঠেলে ক্লান্ত মোহাম্মদ আম্মার। তখন দুপুর দেড়টা। মনে হলো বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করে আবার বের হবেন। এমন সময় মনে পড়ে, ভোরে ঢাকা থেকে একজন ফোনে জানিয়েছেন, তাঁর বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ নেই, পাঁচজন নারী-শিশু আছেন। রাত থেকে তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আম্মারের মনটা কেমন করে ওঠে। তিনি শহরের ওই পাড়ায় যান। কিন্তু বাসাটা পাচ্ছিলেন না। পাড়ার অধিকাংশ মানুষই বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছেন। অনেক চেষ্টায় বাসার সন্ধান মেলে। সীমানাপ্রাচীর বরাবর পানি। বাইরে থেকে ডাকাডাকি শুরু করেন। একপর্যায়ে সাড়া মেলে। কিন্তু তাঁরা বের হতে পারছিলেন না। সাঁতরে গেটের চাবি এনে ডুব দিয়ে কয়েকবারের চেষ্টায় তালা গেল খুলে। পরে ওই পরিবারকে উদ্ধার করে আম্মারের দল।

তখনো তাঁর মুঠোফোনে চার্জ আছে। নেটওয়ার্ক আসা-যাওয়া করছে। উদ্বিগ্ন মানুষ দেশ-বিদেশ থেকে কল করছেন। জানতে চাচ্ছেন পরিবারের খবর। বাসার ঠিকানা দিচ্ছে। আরেকটি পরিবারের কথা জানিয়ে মোহাম্মদ আম্মার বলেন, ওই লোক সৌদি আরবে থাকেন। বাসায় মা ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। সেখান থেকে আম্মারকে ফোন করে ওই যুবক হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। আম্মার পড়লেন ভয়াবহ সমস্যায়। যে পরিস্থিতি, ওই পাড়ায় যেতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা লাগবে। পরে রাতে সেখানে গিয়ে দেখেন ঘরে কোনো মানুষ নেই। একপর্যায়ে পাড়ার অন্য এক বাড়িতে তাঁদের সন্ধান পান। মুঠোফোনে ভিডিও কলে স্বামী-স্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ করে দেন।। এ রকম অসংখ্য মানুষের উদ্বেগ, আকুতি ছিল।

বানভাসি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা

১৭ জুন বিকেলে বাসায় ফেরার পর মনে হচ্ছিল, অনেক মানুষ স্কুলে, অফিস-আদালত, নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। মানুষ খালি হাতে বের হয়েছেন। দ্রুত খেয়ে ঘরে থাকা ১০ হাজার টাকা নিয়ে আবার বের হয়ে যান আম্মার। সঙ্গে পাড়ার আরও তিনজন তরুণ। তাঁরা চিড়া, গুড়, মুড়ি, মোমবাতি, দেশলাই কেনেন। শহর ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করেন। পরদিনও তাঁরা বিভিন্ন স্থানে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করেন।

দুর্গতদের পাশে মানুষ

১৯ জুন বিকেল থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমে। আতঙ্কে থাকা বানভাসি মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পান। বিকেল থেকে কোথাও কোথাও মোবাইলের নেটওয়ার্কও আসতে শুরু করে। আম্মার ও তাঁর সঙ্গীরা শহরের পাশাপাশি হাওর এলাকায় নৌকা নিয়ে যান। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে খাবার দিতে থাকেন। ইতিমধ্যে মোহাম্মদ আম্মারকে দেশে-বিদেশ থেকে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরাও অর্থসহায়তা দিতে থাকেন। এই অর্থ দিয়ে প্রতিদিন খাদ্যসামগ্রী কিনে নৌকা নিয়ে বের হন তাঁরা। কখনো আশ্রয়কেন্দ্রে, কখনো মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন। এখনো সেটি অব্যাহত আছে। এ পর্যন্ত দুই হাজারের মতো পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন তাঁরা। মোহাম্মদ আম্মার জানান, একই সঙ্গে তাঁরা মধ্যবিত্তদের জন্য আলাদা সহায়তা দিচ্ছেন। শুরু থেকেই এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে তাঁরা ফোন পান, যাঁরা কখনো ত্রাণের সারিতে দাঁড়াবেন না। কিন্তু ঘরে কোনো কিছু নেই। পরিবার নিয়ে আছেন বেকায়দায়। এমন চার শ পরিবারকে সহযোগিতা পৌঁছে দিয়েছেন তাঁরা। এটি এখনো অব্যাহত আছে।

দুর্গম হাওরের গ্রামে

পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পর তাঁরা গ্রামে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখনো সেটি করে যাচ্ছেন। মোহাম্মদ আম্মার বলেন, ‘সব জায়গায় আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। কিছু কিছু জায়গা নির্ধারণ করে আমরা সেখানে গেছি।’ তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহায়তা নিয়ে আসা অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমন অন্তত এক শ ব্যক্তি ও সংগঠনকে সঙ্গে থেকে ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করেছেন। অনেকের নৌকা ভাড়া পর্যন্ত দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর শর্ত ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে যেতে হবে। অনেকেই সেটি করেছেন। কয়েকটি ঘর সংস্কারেও সহায়তা করেছেন তাঁরা। আম্মার ও তাঁর সঙ্গীরা ঈদের আগের দিন দুই শ পরিবারকে সেমাই, লাচ্ছি, দুধ, চিনি, ময়দাসহ ঈদসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। বেশ কিছু পরিবারকে দিয়েছেন নতুন কাপড়। ঈদের দিন মানুষের সহায়তায় ১৮০টি বন্যার্ত পরিবারের মধ্যে বিতরণ করেছেন কোরবানির মাংস। সঙ্গে মসলা।

default-image

করোনাকালে মানুষের পাশে

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা কেউ মারা গেলে আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত যখন লাশ দাফন করছিল না, আম্মার তখন ফেসবুকে ঘোষণা দেন মৃত ব্যক্তির দাফন কাজ করতে তিনি প্রস্তুত। এরপর সুনামগঞ্জের প্রথম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তি থেকে শুরু করে অধিকাংশ লাশের দাফনে তিনি যুক্ত ছিলেন। কেউ মারা গেলেই প্রশাসন থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। এ কাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন শহরের মদনীয়া মাদ্রাসার দুই তরুণ শিক্ষক হাফিজ মাওলানা হাম্মাদ ও হাফিজ মাওলানা তোহা। মোহাম্মদ আম্মার বলেন, তখন বালিশের কাছে পিপিই নিয়ে ঘুমাতাম। কখন ডাকে আসে। মানুষ যে তখন কত অসহায় ছিল, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।

এলাকার কয়েকজন তরুণকে নিয়ে কয়েক বছর ধরে আরেকটি মহৎ কাজ করেন আম্মার, পবিত্র রমজান মাসে রাস্তাঘাটে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন, প্রতিবন্ধী লোকদের খাবারের ব্যবস্থা। তখন খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় এসব মানুষ বিপাকে পড়েন। তাঁরা রান্না করে ঘুরে ঘুরে দুই বেলা খাবার দেন তাঁদের। পাশাপাশি তাঁদের পরিচ্ছন্নতার কাজও করে দেন তিনি।

আম্মার ব্যাডমিন্টন খেলেন

মোহাম্মদ আম্মার ব্যাডমিন্টনে জেলা চ্যাম্পিয়ন। জাতীয় পর্যায়েও খেলেন। খেলতে গিয়ে দেশের অধিকাংশ জেলা ঘুরেছেন। অনলাইনে তিনি ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রি করেন। নিজের ব্যবসার টাকা থেকে এবার বন্যার্তদের সহায়তা করেছেন প্রথম দিকে। ফেসবুকে তাঁর দুটি গ্রুপ—‘মানবসেবায় ব্যাডমিন্টন’, ‘আম্মার ব্যাডমিন্টন’।

মানবসেবায় ব্যাডমিন্টন গ্রুপটি তিনি করোনাকালে শুরু করেছিলেন। তিনি যেকোনো উদ্যোগ নিলেই এসব গ্রুপে থাকা এবং দেশ-বিদেশের ব্যাডমিন্টন কমিউনিটির লোকজন তাঁর পাশে দাঁড়ান। ব্যাডমিন্টন কমিউনিটি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে থাকা প্রবাসীরাও তাঁর উদ্যোগে সহযোগিতা করেন। এবার বন্যায় অনেকেই তাঁর মাধ্যমে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখনো সহযোগিতা অব্যাহত আছে।

মোহম্মদ আম্মার পড়াশোনা করেছেন মাদ্রাসায়। দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত। সংসারে বাবা, মা, স্ত্রী ও ভাইবোন আছেন। শহরের তেঘরিয়া এলাকায় বাসা। গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের লালপুর গ্রামে। মোহাম্মদ আম্মার জানান, পরিবারের সহযোগিতা না পেলে এসব কাজ কখনোই করতে পারতেন না। সবাই উৎসাহ দেন। তাই মানুষের যেকোনো বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ বা ডাক পেলে তিনি অস্থির হয়ে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘এসব কাজে আমি আনন্দ পাই, তৃপ্তি পাই। এই বন্যা আমার চেয়ে শহরের অনেক তরুণ-যুবক আরও বেশি কাজ করেছেন। সবার সঙ্গে আমি সামান্য চেষ্টা করেছি মানুষের পাশে দাঁড়াতে।’

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন