আপনিও কি ‘কোয়ার্টার লাইফ ক্রাইসিসে’ ভুগছেন
২০২৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তৌফিক হাসান (ছদ্মনাম)। তিন বছর পেরিয়েছে, এখনো বেকারত্ব ঘোচাতে পারেননি। বর্তমানে ঢাকায় আছেন। একসময় ফেসবুক, লিংকডইনের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সময় দিতেন, কাজ খুঁজতেন। এখন সেটাও কমিয়ে দিয়েছেন। বন্ধুদের কেউ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, কেউ ব্যাংকে, কেউ সরকারি চাকরিতে। তাঁদের পোস্টের নিচে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছার বন্যা। দেখে ভালো লাগে, কিন্তু একধরনের হতাশাও কাজ করে। কিছুদিন আগেও একসঙ্গে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়েছেন, রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট করেছেন। এখন সবার পথ আলাদা। মনে হয় তৌফিক একাই থমকে আছেন, বাকি সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে হঠাৎ জেঁকে ধরা এই শূন্যতাকেই বলে ‘কোয়ার্টার লাইফ ক্রাইসিস’।
চার-পাঁচ বছর ক্যাম্পাসের নিয়মিত রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন একজন শিক্ষার্থী। সকাল আটটায় ক্লাস, ল্যাব, দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যানটিনে খাওয়া, বিকেলে আড্ডা আর রাতে অ্যাসাইনমেন্ট বা পরীক্ষার পড়া। এই পুরো সময়টাতে একটা নির্দিষ্ট পরিচয় থাকে—আমি একজন ‘শিক্ষার্থী’। কিন্তু সমাবর্তনের গাউন খুলে ফেলার পর বা ফাইনাল পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজলে হঠাৎ সেই পরিচয়টা মুছে যায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আর ক্লাস থাকে না, সিলেবাস থাকে না, তাড়া থাকে না। চাকরি কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতেও অনেক সময় মনোযোগ আসে না। চারপাশের নানা পরিস্থিতি তাঁকে আরও বেশি হতাশ করে দেয়।
বিষয়টা বুঝিয়ে বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাউফুন নাহার, ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা একটা বড় সমস্যা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ফলে নতুনেরা পিছিয়ে পড়ে। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের শিক্ষাগত জ্ঞান ও কর্মক্ষেত্রে বাস্তব যে দক্ষতার প্রয়োজন হয়—দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে, যাকে বলে স্কিল গ্যাপ। আবার অনেক ক্ষেত্রে সবকিছু থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় নেটওয়ার্কিং বা রেফারেন্সের অভাব। ক্যারিয়ারের শুরুতে কম বেতন ও চাকরির অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এই সময় এক দিকে ক্যারিয়ারের নানা টানাপোড়েন, পরিবারের প্রত্যাশা, বিয়ে করে পরিবার তৈরির ভাবনা—সব মিলিয়ে তরুণদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ অনুভূত হতে পারে।’
‘পাস তো করলে, চাকরি কবে’
তৌফিকের মতো হাজারো তরুণের দিন শুরু হয় জব পোর্টালে সিভি ড্রপ করে। কেউবা হয়তো সকাল উঠেই কোনো না কোনো লাইব্রেরিতে জায়গা খোঁজেন, একটু ব্যস্ত সময় কাটানোর আশায়। কিন্তু এসবের চেয়ে বড় লড়াইটা লড়তে হয় সমাজের মানসিকতার সঙ্গে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার মাস ঘুরতে না ঘুরতেই চারপাশ থেকে প্রশ্ন আসতে থাকে—‘পাস তো করলে, চাকরি করছ কোথায়?’ কিংবা ‘অমুকের ছেলে তো অমুক জায়গায় ঢুকে গেল, তুমি কী করছ?’
এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নবাণ থেকে বাঁচতে অনেক তরুণ ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। আড্ডা, পারিবারিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে। অনেকে ঈদের ছুটিতেও বাড়ি যায় না। অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এমনটাই শোনা গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ফারিয়া (ছদ্মনাম) বলছিলেন, ‘একটা সময় ছিল শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করতাম। এখন শুক্রবার এলে ভয় লাগে। মনে হয়, আরও একটা সপ্তাহ চলে গেল, আমি বেকার। এই সময়গুলো কবে শেষ হবে, শুধু সেই সময়টার অপেক্ষা করি। জানি না সামনে কী আছে।’
আত্মবিশ্বাসের পতন
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কোয়ার্টার লাইফ ক্রাইসিস সাধারণত জীবনের ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ সময় একজন তরুণ তাঁর জীবনের লক্ষ্য, নিজের যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। টানা কয়েক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে বাদ পড়ার পর অনেকেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। ভাবতে শুরু করেন, ‘আমার কি সত্যিই কোনো যোগ্যতা নেই? আমি কি তবে ভুল সাবজেক্টে পড়লাম?’
এই আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। নিজের অজান্তেই তরুণেরা ‘ইমপোস্টার সিনড্রোম’-এ ভুগতে শুরু করেন। আগের সব অর্জনকে মনে হয় তুচ্ছ, ঘিরে ধরে হতাশা। কিন্তু এই সংকটের দায় কি শুধুই শিক্ষার্থীদের? পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আমাদের দেশে প্রতিবছর কয়েক লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। আবার যে পদগুলো ফাঁকা থাকছে, সেখানে নিয়োগকর্তারা খুঁজছেন ‘অভিজ্ঞতা’ এবং ‘সফট স্কিলস’। থিওরি পড়ে পাস করা একজন গ্র্যাজুয়েট যখন হঠাৎ করে করপোরেট দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন, তখন তিনি খেই হারিয়ে ফেলে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের কিছু পরামর্শ দিলেন রাউফুন নাহার, ‘জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করার জন্য তরুণদের শুরু থেকেই দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল স্কিল ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, পার্টটাইম কাজ বা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে খুব কাজে আসে। পাশাপাশি নেটওয়ার্কিং বাড়াতে শিক্ষক, সিনিয়র ও পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।’