রোজ গার্ডেন—অপমান থেকে ইতিহাসের সাক্ষী যে প্রাসাদ
এই শহরের গায়ে লেখা আছে প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস। মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ–পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এই লাখ লাখ ইট–পাথরের স্থাপনার ভেতরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু স্থাপনা, যা শুধু দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে না, জানান দেয় ঢাকার প্রাচীন ইতিহাসেরও। ইতিহাসের তেমন এক রাজসাক্ষী ‘রোজ গার্ডেন’। সম্প্রতি সংস্কারের পর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই বাগানবাড়ি। টিকাটুলীর কে এম দাস লেনে কোন ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই রোজ গার্ডেনের সঙ্গে? জানাচ্ছেন মৃণাল সাহা
রাজধানীর ইট–পাথরের ভিড়ে কিছু কিছু স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে। বিশেষ করে রাজধানীর পুরান ঢাকায় চলতে–ফিরতে এ রকম অনেক স্থাপনা এখনো খুঁজে পাওয়া যায়।
এর মধ্যে আলাদাভাবে নজর কাড়ে শ্বেতশুভ্র রোজ গার্ডেন। বিশ শতকের শুরুর দিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে একটু অর্থকড়ি আসতেই শুরু হয় বাগানবাড়ি বানানোর হিড়িক।
সেই ধারায় তৈরি হয় বিউটি বোর্ডিং ও বলধা গার্ডেনের মতো বিখ্যাত বাগানবাড়ি। তাদের সঙ্গে কালের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোজ গার্ডেন। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে রোজ গার্ডেন তৈরি করেন তৎকালীন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ঋষিকেশ দাস।
যেভাবে রোজ গার্ডেন
কথিত আছে, রোজ গার্ডেনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল অপমানের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই ছিলেন অভিজাত পরিবারের সদস্য। বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই তাঁদের জমিদারির অর্থবিত্ত কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ে উন্নতি করেছিলেন।
ঋষিকেশ দাস ছিলেন তাঁদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। খুবই সাধারণ একটি পরিবার থেকে এসে রাতারাতি ব্যবসায়ে সুনাম করেছিলেন। ইট–সুরকি থেকে শুরু করে চুন, কাঠ ও কয়লা ব্যবসায়ে নাম কামিয়েছিলেন নিজ গুণে।
কিন্তু খানদানি পরিবারের লেবাস তাঁর গায়ে ছিল না। যে কারণে নিয়মিতই তাচ্ছিল্যের শিকার হতেন তিনি। শোনা যায়, জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর বাগানবাড়ি বলধা গার্ডেনে এমনই একটি আয়োজনে পারিবারিক পরিচয় ও জাত নিয়ে বেশ অপমানের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে।
সেখান থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিজ্ঞা করেন, বলধা গার্ডেনের চেয়ে সুন্দর বাগানবাড়ি তৈরি করে দেখাবেন তিনি। যেখানে নিজের মতো করে জলসা করতে পারবেন, তাঁকে অপমান করার সাহস পাবে না কেউ।
বাড়িটি গড়তে না গড়তেই বেচে দিলেন
বাগানবাড়ি তৈরির আগে তৈরি করা হয়েছিল বাগান। গোলাপ ফুলের প্রতি আলাদা আগ্রহ ছিল ঋষিকেশ দাসের। ১৯৩০ সালে ২২ একর জমির ওপর বিভিন্ন প্রজাতির গোলাপ ফুলের চারা লাগানো শুরু করেন ঋষিকেশ।
গোলাপ ফুল সংগ্রহ করতে চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের নানা দেশে লোক পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকে মাটিসহ গোলাপের চারা এনে রোপণ করেন নিজের বাগানবাড়িতে। বাগান তৈরির প্রায় এক বছর পর শুরু হয় বাড়ি তৈরির কাজ।
গোলাপের সঙ্গে মিলিয়ে বাড়ির নাম রাখেন ‘রোজ গার্ডেন’। কিন্তু সেই রোজ গার্ডেন নিজের করে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। শখ ও জেদ হার মানে অর্থের বাস্তবতার কাছে।
বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে নিজের বিশাল অর্থবিত্তের সব বলি দেন ঋষিকেশ। টাকাপয়সা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে শখের রোজ গার্ডেন বিক্রি করে দেন ঢাকার তৎকালীন এক পুস্তক ব্যবসায়ী কাজী আবদুর রশীদের কাছে।
কেমন নকশা
ঋষিকেশ দাস তাঁর বাগানবাড়িটি গড়তে চেয়েছিলেন ইউরোপিয়ান আদলে। তিনি যে বেশ শৌখিন মানুষ ছিলেন, তা বোঝা যায় তাঁর বাগানে গোলাপের জাত দেখেই। বাড়িতেও ইউরোপিয়ান ধাঁচের ছোঁয়া।
আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুজাবা বিনতে কবির বলেন, ‘পুরান ঢাকার বেশির ভাগ বাগানবাড়িতেই মোটিফ নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
কলোনিয়াল আমলের ভবনগুলোকে রাজসিক করে তুলতেই এ ধরনের মোটিফ নিয়ে কাজ করা হতো। রোজ গার্ডেনও তেমনই।’
সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের দোতলা প্রাসাদে দেখা যায় করিন্থীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর ব্যবহার। বাড়ির প্রতিটি কলামে বা স্তম্ভে রয়েছে করিন্থীয় মোটিভ।
এ ছাড়া রয়েছে মার্বেল পাথরের মেঝে, ছাদে ইউরোপীয় শৈলীর কারুকাজ ও খিলান আকৃতির দরজা। দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি, প্রশস্ত সিঁড়ি ও জানালায় খোদাই করা কাজ। বিশাল গোলাপ ফুলের বাগান আর তার মধ্যে শ্বেতপাথরের কয়েকটি ভাস্কর্য, কৃত্রিম ফোয়ারা, শানবাঁধানো পুকুর—সব মিলিয়ে ঋষিকেশ দাস যে ইউরোপিয়ান রাজপ্রাসাদের আদলে নিজের শখ ও জেদ পূরণ করতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
বাগানবাড়িতে প্রবেশের মুখেই রয়েছে মার্বেলের প্রশস্ত সিঁড়ি। প্রবেশমুখেই আপনাকে স্বাগত জানাবে দুটি ভাস্কর্য। প্রাসাদের নিচতলায় রয়েছে মোট পাঁচটি ঘর। এর মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বড় হলঘর। এখানেই পরবর্তী সময় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা খোশগল্পে মেতে উঠতেন।
বলরুমের সিলিংয়ে রয়েছে ফুলেল নকশা ও সবুজ কাচের আয়না। ওপরের তলায় রয়েছে তিনটি রুম। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল একটি নাচঘর। মূলত এই জলসাঘরের জন্যই বিশাল আয়োজন করে রোজ গার্ডেন তৈরি করেছিলেন ঋষিকেশ দাস। যদিও সেখানে জলসা দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর।
প্রতিটি কামরায় সাজানো আছে সেই সময়কার আসবাব। এসব দেখে বোঝা যায়, কতটা রুচিশীল ও শৌখিন ছিলেন ঋষিকেশ দাস। যদিও বিক্রি করে দেওয়ার পর বাড়ির বাকি কাজ শেষ করেছিলেন কাজী আবদুর রশীদ। যে কারণে তাঁর নাম খোদাই করে লেখা আছে রোজ গার্ডেনের গায়ে।
ভবনের প্রতিটি দরজা–জানালায় রয়েছে জ্যামিতিক নকশা; যার বেশির ভাগই কাঠ, রঙিন বেলজিয়ান কাচ ও লোহার কারুকার্য দিয়ে সাজানো। এ ছাড়া বলরুম থেকে একটি স্পাইরাল সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত, যা এখন আর ব্যবহার করা হয় না। বাড়ির সামনে বাগান ছাড়া আছে বড় আকারের একটি পুকুর।
যুগে যুগে নানা পরিচিতি
ঋষিকেশ দাসের বিলাসবহুল প্রাসাদটি নানা সময়ে নানা নামে পরিচিতি পেয়েছে, তবে কোনো কালেই মূল নামটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। শুরু থেকেই একশ্রেণির লোকের আড্ডা ও আনন্দের জায়গা হয়ে ওঠে বাড়িটি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে উচ্চবিত্ত ও জমিদারদের আড্ডা জমতে থাকে। আবদুর রশীদ মালিকানা পাওয়ার পর এখানে তৈরি করেন প্রভিনশিয়াল লাইব্রেরি।
আবদুর রশীদের মৃত্যুর পর এর মালিকানা পান তাঁর বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ বশীর। তিনি এলাকায় হুমায়ূন সাহেব নামেই বেশি পরিচিত। যাঁর নামে রোজ গার্ডেনকে অনেকে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি বলে ডেকে থাকেন।
স্বাধীনতার ঠিক আগে আগে সত্তরের দশকের শুরুতে এ বাড়িটি লিজ দেওয়া হয় বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেডকে। হারানো দিন নামের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছিল এই প্রাসাদে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৯ সালে রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন হিসেবে ঘোষণা করে।
এর ফলে মালিকানা আবদুর রশীদের পরিবার থেকে সরকারের কাছে চলে যায়। অতঃপর মামলা করে ১৯৯৩ সালে মালিকানাস্বত্ব ফিরে পান কাজী আবদুর রশীদের মেজ ছেলে কাজী আবদুর রকীব।
রকীবের মৃত্যুর পর মালিকানা পান তাঁর স্ত্রী লায়লা রকীব। অবশেষে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকায় প্রাসাদটি কিনে নেয়। উদ্যোগ নেয় এটিকে জাদুঘর বানানোর।
যুগে যুগে রোজ গার্ডেনের নাম বদলেছে বহুবার। কখনো রশীদ মঞ্জিল, কখনো ‘বেঙ্গল স্টুডিও’, আবার কখনো বাড়িটি পরিচিত ছিল ‘হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি’ নামে।
বাংলাদেশ–ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদেরা এই প্রাসাদে থেকেছেন। এই প্রাসাদের বলরুমে যাত্রা শুরু হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকাটুলীর কে এম দাস লেনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রোজ গার্ডেন।
যেতে চাইলে জেনে রাখুন
প্রায় তিন বছর সংস্কারকাজ শেষে গত বছর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে প্রাসাদটি। বর্তমানে পুরো প্রাসাদটিই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। মাত্র ৩০ টাকায় টিকিট কেটে যে কেউ দেখে আসতে পারেন ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রাসাদ।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই টিকিটের মূল্য মাত্র ১০ টাকা। আর ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো টিকিট লাগে না। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আর গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে প্রাসাদ প্রাঙ্গণ।
তথ্য সহযোগিতা: নুজাবা বিনতে কবির, সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়