
ঋতুর হিসাবে বর্ষা চলে গেছে; কিন্তু বৃষ্টি চলছে। ঘন ঘন তাপমাত্রার ওঠানামা শরীরে প্রভাব ফেলছে। বৃষ্টিতে বন্যা-জলাবদ্ধতা সঙ্গে করে নিয়ে আসছে নানা রোগের জীবাণু। শিশুবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময় তাই শিশুর দিকে বাবা-মায়ের বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
শিশুবিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষার রোগগুলো মূলত পানিবাহিত। এ মৌসুমে বড় শহরগুলোতে পানি জমছে, জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় সুয়ারেজ লাইনের দূষিত বর্জ্য পানির লাইনে চলে আসছে। এতে ডায়রিয়া, কলেরা, রোটা ভাইরাসের জীবাণু পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আবার বন্যার্ত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দূষিত পানি পান করে মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই এসব জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া পানিদূষণের কারণে শিশুদের মধ্যে টাইফয়েড, জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই), রক্ত আমাশায়—এসব রোগেরও প্রকোপ বাড়ে। দূষিত পানিতে গোসলের কারণে চুলকানি, খোস-পাঁচড়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে শহরগুলোতে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। শিশুবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, পানিবাহিত পেটের অসুখের পাশাপাশি এ মৌসুমে মশাবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বৃষ্টির জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশা জন্মায়। এই বছর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে চিকুনগুনিয়া রোগবাহী এডিস মশা। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে অনেকের মৌসুমি হাঁপানি বাড়ে। বিশেষ করে শিশুদের অনেকে ব্রঙ্কিওলাইটিসের কারণে তীব্র কাশিতে ভোগে।
এ মৌসুমের রোগগুলো থেকে বাঁচতে শিশুর জন্য বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে জোর দিয়েছেন তাঁরা। মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, প্রথমেই শিশুর জন্য নিরাপদ খাওয়ার পানি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পানির সঙ্গে খাবারের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। বাসি বা উন্মুক্ত খাবার শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। বারবার বমি আর পাতলা পায়খানা হলে শিশুর বয়স অনুযায়ী বুকের দুধ বা স্বাভাবিক খাবারের সঙ্গে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। অধ্যাপক আবিদ বলেন, পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত শিশুর পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে, প্রশ্রাবের মাত্রা কমে গেলে, বারবার বমি হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
বর্ষাকালের দুর্ঘটনাজনিত বিপদ
এ সময় শিশুরা কিছু দুর্ঘটনাজনিত বিপদেরও মুখোমুখি হয়। আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, পানিতে ডোবা, সাপে কাটা, ভাঙা রাস্তায় দুর্ঘটনার মতো দুর্যোগগুলো বর্ষাকালেই বেশি হয়। এ বিষয়গুলো নিয়েও বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে। পুকুর-জলাশয় থেকে শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। ঝোপঝাড়ে একা একা যেতে দেওয়া যাবে না। আর এডিস মশা থেকে বাঁচতে বাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার আর বাড়িতে আক্রান্ত কেউ থাকলে তার কাছ থেকে শিশুকে দূরে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
ডায়রিয়া
বর্ষা মৌসুমে পানিবাহিত রোগগুলোর মধ্যে প্রধান হলো ডায়রিয়া। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। স্বাভাবিকের চেয়ে ঘন ঘন বা ২৪ ঘন্টায় তিনবারের বেশি পাতলা পায়খানা হলে সেটাকে ডায়রিয়া বলে ধরে নেওয়া যায়। এ রোগটি বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ।
বার বার পাতলা পায়খানা সঙ্গে ডায়রিয়ার অন্য লক্ষণগুলো হলো:
l বমি
l অরুচি
l দুর্বলতা
l হালকা জ্বর
করণীয়
l রোগীকে বার বার খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।
l তরল খাবার, যেমন– ডাবের পানি, চিড়ার পানি, ডালের পানি, ভাতের মাড়, জাউভাত রোগীকে খেতে দিতে হবে। পাশাপাশি স্বাভাবিক খাবারও চলবে।
l ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে স্যালাইনের পাশাপাশি মায়ের দুধ বার বার খেতে দিতে হবে।
l ডায়রিয়ার তীব্রতা বেশি হলে বা সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ থাকলে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে নিতে হবে।