বিভিন্ন বয়সে মানসিক সমস্যা

ডা. তানিয়া আলমের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ডা. অভ্র দাশ ভৌমিক

শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও যে জরুরি, সে বিষয়ে আমরা অনেকেই উদাসীন। জীবনের বিভিন্ন বয়সে নানা ধরনের চাপের কারণে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে সম্প্রচারিত হয় এসকেএফ নিবেদিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তিন পর্বের অনুষ্ঠান ‘যত্নে রাখি মনচিঠি’।

ডা. তানিয়া আলমের সঞ্চালনায় প্রথম পর্বে অতিথি ছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অভ্র দাশ ভৌমিক। এ পর্বের আলোচ্য বিষয় ছিল: বিভিন্ন বয়সে মানসিক সমস্যা। অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং এসকেএফের ফেসবুক পেজে সম্প্রচারিত হয়।

ডা. অভ্র দাশ ভৌমিক জানান, কোনো ব্যক্তির যে মানসিক সমস্যা হচ্ছে, সেটিই প্রথমে বুঝতে হবে। বোঝার সাধারণ উপায়গুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে ঘুম ও খাওয়ার ব্যাপারে অনিয়ম। অনেক সময় কোনো ব্যক্তির হঠাৎ মুড চেঞ্জ হয়। অর্থাৎ, সে স্বাভাবিক সময় যে আচরণ করে, তার বাইরে কিছু করাও এর একটি লক্ষণ। যেমন হঠাৎ করে অতিরিক্ত আনন্দিত হওয়া, অতিরিক্ত কান্না কিংবা খুব বেশি রেগে যাওয়া, অর্থাৎ স্বাভাবিক সময় সে ব্যক্তির আচরণে যা দেখা যায় না, তেমন কিছু ঘটলে বুঝতে হবে সে মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

কোনো ব্যক্তি আগে যে কাজ করত সে কাজে মন দিতে না পারাও এর একটি লক্ষণ। যেমন মানসিক সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সে লেখাপড়ায় ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারছে না। অনেকে আবার অফিশিয়াল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। এমন যদি হয় যে তাঁর চিন্তাভাবনার মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি তাঁর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অনেক সময় দেখা যায়, কারও কারও সেনসিটিভিটিতে সমস্যা হচ্ছে। যেমন শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা অনেকটা খিটখিটে হয়ে যায়। অল্প কিছুতেই তারা খুব স্পর্শকাতর আচরণ করে কিংবা খুব বেশি রকম আবেগ প্রকাশ করে। আবার ঠিক তার উল্টোটাও হতে পারে। যেমন একটি শিশু যদি কোনো কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখায়, সে ক্ষেত্রেও তার মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবার এমন যদি হয় যে কোনো ব্যক্তি তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত না, অর্থাৎ সামাজিকভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছে না। কখনো কখনো কারও কারও মধ্যে অযৌক্তিক বিষয় নিয়ে ভাবতে দেখা যায়। যেমন ম্যাজিক্যাল থিঙ্কিং বা ব্ল্যাক ম্যাজিক ইত্যাদি। এমন হলে বুঝে নিতে হবে সে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার হ্যালুসিনেশনও হতে দেখা যায়।

প্রতীকী ছবি
ছবি: পেকজেলসডটকম

বয়সভিত্তিক কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের মায়েরা অনেক সময় যথার্থভাবে সময় দিতে পারেন না। তখন শিশুদের মানসিক গঠনটা ঠিকভাবে হয় না। কারণ, মস্তিষ্কের গঠন শিশুর জন্মের প্রথম ৫ বছরের মধ্যেই হয়ে থাকে। সুতরাং, শিশুর মায়ের গর্ভবতী অবস্থায় এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার পর, অর্থাৎ আর্লি অ্যাটাচমেন্ট বিষয়টি মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা শৈশবের শুরুতে সবচেয়ে বেশি সেপারেশন এংজাইটিতে ভোগে; অর্থাৎ কোনো শিশুর সঙ্গে তার মায়ের দূরত্ব তৈরি হলে মাকে হারানোর ভয় থেকে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুর জীবনের পরবর্তী ধাপে তার স্কুলভীতি দেখা দিতে পারে। আবার শিশুর দুই বছর বয়সের পর থেকে অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে। এর পেছনে জেনেটিক এবং সোশ্যাল দুই ধরনের কারণই থাকতে পারে। আবার শিশুর জন্মের পরই তার মা মারা গেলে কিংবা শিশুকে তার মা যথার্থভাবে সময় দিতে না পারলে দাদা-দাদি বা নানা-নানির পর্যাপ্তভাবে সময় দিতে হবে, যাতে শিশুটি নিরাপদ বোধ করে এবং তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে।

কৈশোর ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই কিছুটা জটিল। কারণ, তাদের যেমন শিশুদের দলে ফেলা যায় না, তেমনি আবার প্রাপ্তবয়স্কদের কাতারেও ফেলা যায় না। ফলে তারা একধরনে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়। এ সময় তারা খুব বেশি আবেগপ্রবণ থাকে। ফলে মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের সাহায্য খুব বেশি দরকার হয়। এ সময় তাদেরকে ভুলগুলো বুঝিয়ে না বলে উল্টো বকাঝকা করলে কিংবা তাদের সঙ্গে পরিবারের অ্যাটাচমেন্ট কম থাকলে তারা অভাববোধ থেকে ভুল করে বসতে পারে। এ জন্য তারা যেন ভুল পথে পা না বাড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ ছাড়া হাইপার অ্যাক্টিভিটির জন্য মেডিটেশন এবং ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন।

মধ্যবয়স সাধারণত ধরা হয় ৪৫-৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত। এ বয়সে অনেক সময় দায়িত্বের চাপ বেড়ে যায়। স্বাবলম্বী না হওয়ার কারণে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেকে তাঁর অভিভাবক হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন না কিংবা অসহায় বোধ করেন। এ সময় পরিবারের, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ ছাড়া এ সময় অনেকের কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার এসব রোগের শুরু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ বয়সেই হয়ে থাকে। এ কারণে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাই সব ধরনের মানসিক সমস্যায় পরিবারের পক্ষ থেকে সহিযোগিতা খুবই জরুরি এবং প্রয়োজনবোধে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।