বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভাইরাল হেপাটাইটিস রোগের লক্ষণগুলো

সাধারণত রোগী ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব কিংবা কোনো কোনো সময় বমি, শরীরব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব, হলুদ রঙের চোখ ও প্রস্রাব নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসে। লক্ষণগুলো কোনো সময় এত মৃদু থাকে যে, তা রোগীর নজর এড়িয়ে যায়। এ ছাড়া কখনো এমন হতে পারে যে, রোগী রোগের শেষ পর্যায় যেমন, অবচেতন অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসে।

রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা

সাধারণত রক্তের দুটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় রোগীর হেপাটাইটিস আছে কি না। যেমন রক্তের বিলিরুবিন ও এসজিপিটি। রোগীর রক্তে বিলিরুবিন ও এসজিপিটির মাত্রা সাধারণত বেশি পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসজিপিটির মাত্রা বেড়ে কয়েক হাজারও হয়ে থাকে। এ ছাড়া যদি আমরা জানতে চাই কোন ভাইরাস দিয়ে হেপাটাইটিস হয়েছে তাহলে রক্তে ভাইরাসগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা সম্ভব।

এই রোগের চিকিৎসা

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হালকাভাবে আক্রান্ত রোগীকে বাসায় রেখেই চিকিৎসা করা সম্ভব। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের পর রোগীকে বাসায় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। রোগীকে ঘরে তৈরি স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। অতিরিক্ত বমি হলেও রোগী যদি মুখে একেবারে খেতে না পারে সে ক্ষেত্রে শিরাপথে স্যালাইন গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

লক্ষণগুলো প্রাথমিক অবস্থায় যত বেশি থাকে পরে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী তিন সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে রোগের মাত্রা যদি বেশি হয় এবং রোগীর অবস্থা জটিল থাকে, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে (৯০ শতাংশের বেশি) রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এমন জটিল হয়ে যায় যেটাকে আমরা লিভার ফেইলিউর বলে থাকি। সে ক্ষেত্রে রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে। এ অবস্থায় রোগীর জীবনের ঝুঁকি থাকে এবং প্রয়োজনে উন্নত দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা করা হয়।

ব্যথার ওষুধ সেবন

প্রাথমিক অবস্থায় যেহেতু রোগীর জ্বর জ্বর ও শরীর ব্যথা থাকে, সে জন্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা ও জ্বরের জন্য ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল খাওয়ার প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো প্রয়োজনে অল্প পরিমাণ প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। তবে বেশি প্যারাসিটামল ও ব্যথানাশক ওষুধ সেবন ঠিক নয়। অন্যান্য ওষুধ, যেগুলো রোগী নিয়মিত সেবন করে, সে ব্যাপারেও অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রোগ প্রতিরোধে...

আমরা প্রথমে বলেছি যে ভাইরাসগুলো আমাদের শরীরে দুই ভাবে ঢুকে থাকে। তাই প্রতিরোধের ব্যাপারও ভিন্ন। যেমন হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস প্রতিরোধে আমাদের বিশুদ্ধ পানি ও বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। পানি সম্ভব হলে ফুটিয়ে পান করা উচিত। এ ছাড়া বাইরের কাঁচা খাবার বিশেষ করে নিম্নমানের ফাস্ট ফুড, ফুচকা, চটপটি, বিভিন্ন রকম শরবত যেমন আখের রস, লেবুর শরবত পান না করাই উচিত। এ ছাড়া শিশুদের সম্ভব হলে হেপাটাইটিস–এ ভ্যাকসিন নিতে হবে।

হেপাটাইটিস বি এবং সি প্রতিরোধে একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ানটাইম) সিরিঞ্জ বা সুচ ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া রক্ত বা রক্ত উপাদান গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অবশ্যই হেপাটাইটিস বি এবং সি পরীক্ষা করে রক্ত নেওয়া উচিত। ছেলেদের মুসলমানি, মেয়েদের নাক ও কান ফোটানোর সময় এবং দাঁতের চিকিৎসায় ও অন্যান্য শল্যচিকিৎসায় বিশুদ্ধ ছুরি, কাঁচি, সুচ ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া সব বয়সের নারী-পুরুষকে বি ভাইরাস প্রতিরোধে অবশ্যই হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।

প্রসূতিকালীন সতর্কতা

প্রসূতিকালীন ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, প্রসূতিকালে ভাইরাল হেপাটাইটিসে মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। প্রসূতি যদি হেপাটাইটিস বি বা সি–তে আক্রান্ত থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর সন্তানকে হেপাটাইটিস থেকে রক্ষার জন্য অতিরিক্ত সাবধানতা এবং বি ভাইরাসের ক্ষেত্রে জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিউলিন দেওয়া জরুরি।

অপচিকিৎসা

প্রায়ই ভাইরাল হেপাটাইটিস রোগীকে বিভিন্ন রকম অপচিকিৎসার শিকার হতে হয়। যেমন হাত ধোয়ানো, মালা পরানো, বিভিন্ন রকম গাছের পাতা ও রস খাওয়ানো হয়। এ ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ, অবশ্যই এগুলো পরিত্যাগ করতে হবে। এগুলো কোনো উপকার তো করেই না, বরং এসবে রোগীর মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।

লেখক: সাবেক বিভাগীয় প্রধান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন