যে জন্ডিস সারাতে লাগে অস্ত্রোপচার

স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খাবার পরিপাকের জন্য পিত্তরস পিত্তথলি থেকে বেরিয়ে আসে পিত্তনালির মাধ্যমে। পিত্তরসের এই প্রবাহ কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে জন্ডিস দেখা দেয়। এই বাধাজনিত জন্ডিসের চিকিৎসা মূলত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে করতে হয়। আর তাই এ ধরনের জন্ডিসকে বলা হয় সার্জিক্যাল জন্ডিস। এই অস্ত্রোপচার হতে পারে পেট কেটে, হতে পারে পেটে ছিদ্র করে (ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতি), আবার অস্ত্রোপচার হতে পারে গলায় নল ঢুকিয়েও (এন্ডোস্কপির মাধ্যমে)। কারণ অনুযায়ী এর সঠিক চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ণয় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপি ও এন্ডোস্কপি—দুটিরই প্রয়োজন পড়ে।

কারণ জেনে নেওয়া যাক
* পিত্তথলির পাথর, যা পিত্তনালির মুখে আটকে আছে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটিই কারণ)
* পিত্তনালির টিউমার
* কোনো কারণে পিত্তনালি সরু হয়ে যাওয়া
* অগ্ন্যাশয় ও এর আশপাশের টিউমার

উপসর্গ
প্রস্রাব গাঢ় হলুদ দেখায়, চোখের সাদা অংশের রং হলদেটে হয়ে আসে। পায়খানার রং হয় ফ্যাকাসে। সারা শরীরে থাকতে পারে চুলকানি। জন্ডিসের ধরন দেখে সার্জিক্যাল জন্ডিস সন্দেহ করা হয়। তিন ধরনের জন্ডিসকে এর আওতায় ধরা হয়—
১. জন্ডিসের মাত্রা যদি ক্রমাগত বাড়ে
২. প্রায়ই জন্ডিস হয়
৩. জন্ডিসের মাত্রা কমলেও যদি তা কখনোই পুরোপুরিভাবে না সারে।
টিউমারের কারণে জন্ডিস হয়ে থাকলে সেটির জন্য আলাদা কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। টিউমারটি হতে পারে ক্যানসারজাতীয়। সে ক্ষেত্রে রোগীর ওজন কমে যেতে পারে, রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে, পেটে পানি জমতে পারে।

করণীয়
ওপরের লক্ষণ দেখা দিলে সত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পেটের আলট্রাসনোগ্রাম এবং কিছু প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যদি সার্জিক্যাল জন্ডিস প্রতীয়মান হয়, তাহলে তিনি হেপাটো-বিলিয়ারি সার্জনের (অর্থাৎ লিভার-পিত্তথলি-পিত্তনালির অস্ত্রোপচারে পারদর্শী চিকিৎসক) কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পেটের সিটি স্ক্যান, এমআরসিপি (পিত্তনালি ও অগ্ন্যাশয়ের নালির বিশেষ ধরনের এমআরআই) কিংবা ইআরসিপি (এন্ডোস্কপির মাধ্যমে পিত্তনালি ও অগ্ন্যাশয়ের নালির‍ পরীক্ষা) করিয়ে মূল কারণটি নির্ণয় করা হবে। ক্ষেত্রবিশেষে এন্ডোস্কপির সাহায্যে বায়োপসি করাতেও হতে পারে। কারণ অনুযায়ী শুরু করতে হবে চিকিৎসা। তবে যেকোনো ধরনের অস্ত্রোপচারের আগে প্রস্তুতি হিসেবে অবস্থাভেদে কিছু কাজ করে নিতে হয়। যেমন জন্ডিস কমানো, অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা, শিরাপথে স্যালাইন প্রয়োগ প্রভৃতি। এসবের জন্য অস্ত্রোপচারের আগেই হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হতে পারে। তা ছাড়া যদি রোগীর ক্যানসার অনিরাময়যোগ্য অবস্থায় চলে গিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রেও রোগীর কষ্ট লাঘব করার জন্য নানান চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে।

শেষ কথা
জন্ডিসের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে অনেক সহজ চিকিৎসাতেই সেখান থেকে সেরে ওঠা সম্ভব। পিত্তথলির পাথরের কারণে জন্ডিস হলেও দ্রুত চিকিৎসা না নেওয়া হলে জটিলতা বাড়ে। আবার ক্যানসারের কারণে জন্ডিস হয়ে থাকলেও প্রাথমিক অবস্থায় তা ধরা পড়লে কাটাছেঁড়া ছাড়াই এন্ডোস্কপির সহায়তা নিয়ে সারিয়ে তোলা সম্ভব। তাই জন্ডিস হলে কবিরাজি চিকিৎসা, ঝাড়ফুঁক প্রভৃতি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে সময়ের অপচয় না করে বরং জরুরি ভিত্তিতে আপনার নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে যান।

ডা. মাহনাজ তাবাসসুম
জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা
অনুলিখন: ডা. রাফিয়া আলম