default-image

ঝুঁকিতে যারা

পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের গ্রেভস ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৭-৮ গুণ বেশি। ৪০-৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণত রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে যে কেউ যেকোনো বয়সে আক্রান্ত হতে পারে। ধূমপায়ীদের মধ্যে গ্রেভস ডিজিজজনিত চোখের প্রদাহের তীব্রতা বেশি দেখা যায়।

লক্ষণ

হাইপারথাইরয়েডিজমের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যেমন রুচি বৃদ্ধি সত্ত্বেও ওজন হ্রাস, গরম অসহ্য লাগা, অসহিষ্ণুতা, অতিরিক্ত ঘাম, বুক ধড়ফড়, ডায়রিয়া, পেশির দুর্বলতা ও অনিয়মিত মাসিক ইত্যাদি লক্ষণ গ্রেভস ডিজিজেও বিদ্যমান। এগুলোর বাইরে গ্রেভস ডিজিজের স্বতন্ত্র তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। গ্রেভস অপথ্যালমোপ্যাথি, প্রিটিবিয়াল মিক্সেডিমা এবং থাইরয়েড অ্যাক্রোপ্যাচি। গ্রেভস অপথ্যালমোপ্যাথির লক্ষণগুলো হলো চোখ থেকে পানি পড়া, খসখসে বা জ্বালাপোড়াভাব, চোখব্যথা, চোখ বড় হয়ে যাওয়া, গহ্বর হতে চোখ বের হওয়ার উপক্রম, চোখে ঝাপসা দেখা, একই বস্তুকে একাধিক দেখা, দৃষ্টিশক্তি লোপ ইত্যাদি। প্রিটিবিয়াল মিক্সিডিমায় পায়ের ত্বকে বিশেষ পরিবর্তন দেখা দেয়। থাইরয়েড অ্যাক্রোপ্যাচি হচ্ছে অটোইমিউন থাইরয়েড রোগের অতিরিক্ত প্রকাশ।

পরীক্ষা

গ্রেভস রোগ সন্দেহ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে গলা, হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, হাতের কাঁপুনি ইত্যাদি পরীক্ষা করাতে হবে। হরমোন পরীক্ষায় লো টিএসএইচ এবং হাই ফ্রি টিফোর, হাই ফ্রি টি থ্রি পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে থাইরয়েড আপটেক অ্যান্ড স্ক্যান নামের থাইরয়েড ইমেজিং পরীক্ষা করাতে হবে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রেভস রোগকে অন্যান্য থাইরয়েড হরমোনের আধিক্যের কারণ হতে আলাদা করা যায়। টিএসএইচ রিসেপ্টর অ্যান্টিবডি নিরূপণ গ্রেভস রোগের জন্য সুনির্দিষ্ট। অ্যান্টি-টিপিও এবং অ্যান্টি-টিজি অ্যান্টিবডি গ্রেভস রোগে পজিটিভ থাকতে পারে। এ ছাড়া প্রয়োজনে রক্তের বিবিসি, এএলটি, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি বা এমআরআই আরবিট পরীক্ষা করা লাগাতে পারে।

চিকিৎসা

গ্রেভস রোগের তিন ধরনের চিকিৎসা বিদ্যমান। অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন অথবা সার্জারি। কার্বিমাজল, মেথিমাজল ও প্রোপাইল থায়োইউরাসিল—এই তিন ধরনের অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ বিদ্যমান। প্রয়োজন অনুযায়ী ১২-১৮ মাস পর্যন্ত চালানো হয়। অন্যান্য
উপসর্গ ও জটিলতা রোধে বিটা ব্লকার, স্টেরয়েড–জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ কার্যকর না হলে বা বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে বিকল্প হিসেবে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ১৩১ গ্রেভস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তেজস্ক্রিয় আয়োডিন মুখে খাওয়ানো যায়। স্বল্পমূল্য, নিরাপদ এবং ভর্তি না হয়েই বহির্বিভাগে এই চিকিৎসা দেওয়া যায়। তবে গর্ভবতী অবস্থায় তেজস্ক্রিয় আয়োডিন দেওয়া যাবে না এবং গ্রহণের পরবর্তী ৬ মাস গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

গ্রেভস রোগে থাইরয়েড সার্জারি সাধারণত সর্বশেষ চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে ওষুধ ও তেজস্ক্রিয় আয়োডিন গ্রহণে অনিচ্ছুক রোগী, অনেক বড় গলগণ্ড বা সন্দেহজনক ক্যানসারের ক্ষেত্রে গ্রেভস রোগে প্রাথমিকভাবে সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে। তেজস্ক্রিয় আয়োডিন অথবা থাইরয়েড সার্জারির পর আজীবন থাইরক্সিন ওষুধ সেবন করা লাগতে পারে। অতিসাম্প্রতিক গবেষণায় মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি এবং ক্ষুদ্রকণা টিএসএইচ রিসেপ্টর লিগ্যান্ড গ্রেভস রোগের চিকিৎসার ভালো ফল দিয়েছে।

পরামর্শ

গ্রেভস রোগ খুবই প্রচলিত থাইরয়েড রোগ, যার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। গর্ভধারণের সময় গ্রেভস রোগ, নবজাতকের গ্রেভস রোগ, গ্রেভস রোগের সঙ্গে থাইরয়েড ক্যানসার হলে চিকিৎসাপদ্ধতি কিছুটা জটিল। এ জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ জরুরি। এ ছাড়া গ্রেভস অপথালমোপ্যাথির চিকিৎসায় অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, ঢাকা

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন