বিশেষজ্ঞের ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় বাচ্চার নাকি ডাউন সিনড্রোম বলে একটি জন্মগত ব্যাধি আছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বলা যাবে না আর বিশেষ কিছু। বুকের মধ্যে একটু চাপ চাপ কষ্ট হলো আকরামের। ডাক্তার সাহেব অভয় দিলেন যদিও। বললেন, আগে থেকেই ভেঙে না পড়তে এবং পরীক্ষাটি তাড়াতাড়ি করে ফেলতে। অন্য বাচ্চাটি সম্পূর্ণ সুস্থ। ক্রোমোজোম পরীক্ষা করা হলো। এবং একসময় জানা গেল ছোট বাচ্চাটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত।

আসিফ ও মলির প্রথম বাচ্চা হবে। হাসপাতালে আত্মীয়স্বজন ভিড় করছে। একটু পরেই সিজারিয়ান করবে। অনেক অপেক্ষার শেষ হবে আজ। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। বাচ্চা হওয়ার পরপরই নবজাতক বিশেষজ্ঞ আসিফকে জানালেন একটি সংবাদ। বাচ্চার সব ঠিক আছে। কিন্তু ঠোঁট ও তালুকাটা। তবে ডাক্তার অভয় দিলেন যে এটা শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা যাবে। কোনো সমস্যা হবে না।

সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় পড়েছে এই দম্পতি। কিন্তু এটা তো জন্মগত ত্রুটি। প্রথম অস্ত্রোপচার হলো তিন মাস বয়সে। এরপর আবার ১০ মাস বয়সে। এখন একদম ঠিক।

এ দুটোই জন্মগত ত্রুটির উদাহরণ। এমন বহু জন্মগত ত্রুটির কথা জানি আমরা প্রতিনিয়ত। এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে একটি শিশু। জন্মগত ত্রুটি যত বড় ও জটিল, শিশুর বেঁচে থাকার সমস্যাও তত বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সবার সব আনন্দকে বেদনায় পরিণত করে জন্মের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুর মৃত্যু হতে পারে।

এই জন্মগত ত্রুটি কী?

এটা হচ্ছে শিশুর জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে থাকাকালীন ভ্রূণের ত্রুটি ও অস্বাভাবিকত্ব। সমস্যা যা হওয়ার তা ঘটে যায় সবার চোখের আড়ালে গর্ভকালীন ভ্রূণের বেড়ে ওঠার সময়। একবিংশ শতাব্দীর এই উন্নত জীবনেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভ্রূণের এই অস্বাভাবিকত্ব বোঝা গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই কেউই বুঝতে পারে না এটা।

জন্মগত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রুটি ও রোগব্যাধি

গর্ভে লালিত স্বপ্নের শিশুর জন্ম সব মা-বাবা ও পরিবারের জন্য স্বর্গীয় আনন্দের উৎসব। এই আনন্দ আর স্বপ্ন কখনো কখনো ভেঙে পড়ে শিশুর জন্মগত ত্রুটি ও রোগব্যাধিতে। কোনো ক্ষেত্রে তা সারা জীবনের জন্য দুঃখ হয়ে থাকে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, ইউরোপ–আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্বেও জন্মগত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রুটি ও রোগব্যাধি নিয়ে জন্মায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ শিশু। আর অনুন্নত বিশ্বে এর হার আরও বেশি। এই শিশুদের চেহারা–আকৃতি সবকিছুই সারা জীবনের জন্য মা–বাবা ও সমাজের অন্য সবার দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রোমোজোমজনিত অস্বাভাবিকত্ব

বংশানুক্রমে মানুষের যে জিনগত বৈশিষ্ট্য, তা এগিয়ে নিয়ে যায় জিন। আর এই জিনের ধারক ও বাহক হচ্ছে ক্রোমোজোম। মা ও বাবার কাছ থেকে আসে ২৩টি করে ক্রোমোজোম। এই ক্রোমোজোমে থাকে জিন, যার প্রভাবে শিশুর চেহারা, আকৃতি, বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। এই ক্রোমোজোমের সংখ্যা যদি কমবেশি হয়ে যায় অর্থাৎ এটা কম বা বেশি হলেই ঘটে যায় বিপত্তি। হতে পারে ডাউন সিনড্রোম বা আরও অনেক অস্বাভাবিকত্ব।

অন্তঃসত্ত্বাকালীন অসুখ–বিসুখ

অন্তঃসত্ত্বাকালীন কিছু কিছু অসুস্থতা ও নানা রকম অস্বাভাবিকত্ব আনে গর্ভের ভ্রূণের অঙ্গ–প্রত্যঙ্গে। মেয়েদের চিকেন পক্স, রুবেলা ইত্যাদি ভাইরাল সংক্রমণ যদি প্রাথমিক গর্ভাবস্থায় হয়, তবে মারাত্মক ত্রুটি–বিচ্যুতি হতে পারে শিশুর। তেমনি ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ মায়ের থাকলে বাচ্চার ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অসুস্থতাজনিত কারণে হবু মায়ের ওষুধের ব্যবহারও খুব সাবধানতার সঙ্গে করতে হয়। কারণ, কিছু কিছু ওষুধ শিশুর জন্য মারাত্মক হুমকি। মা অ্যালকোহল ও ধূমপানে আসক্ত হলেও বিপদ হতে পারে।

জিনের অস্বাভাবিকত্ব

অনেক ক্ষেত্রেই ক্রোমোজোম ঠিক থাকতে পারে, কিন্তু এক বা একাধিক জিনের মধ্যে আছে অস্বাভাবিকত্ব। ফলাফল মারাত্মক। বহু রোগব্যাধি হয় এই কারণে।

যেমন: সিসটিক ফাইব্রোসিস, হোমোফিলিয়া, সিভিল সেল অ্যানিমিয়া এবং আরও বহু রোগব্যাধি এই জিনের অস্বাভাবিকত্বের ফল।

জেনেটিক, পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত কারণ

এই দুটির মিলন নানা ক্ষেত্রে সমস্যা বৃদ্ধি করে। আমাদের পরিবেশের বিরূপ প্রভাব, রাসায়নিক কীটনাশক ও জেনেটিক সমস্যা একসঙ্গে মিলে এ ক্ষেত্রে শিশুর জন্মকে অস্বাভাবিক করে তোলে। বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়।

অজানা কারণ

কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন অনেক ত্রুটিও একেবারে কম নয়।

প্রতিকার কী?

অনেক রকম জন্মগত ত্রুটি মায়ের অন্তঃসত্ত্বাকালীন উপযুক্ত পদক্ষেপ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা দিয়ে প্রতিকার করা সম্ভব। অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সুষম খাবার, ভিটামিন, ফলিক অ্যাসিড ইত্যাদি গ্রহণ স্বাস্থ্যবান শিশুর জন্ম ও বেড়ে ওঠাকে সাহায্য করে।

মায়ের জন্য অ্যালকোহল, ধূমপান ইত্যাদি অভ্যাস পরিত্যাগ করা জরুরি। মায়ের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গর্ভকালীন টিকা নেওয়া প্রয়োজন আর এভাবেই অনেক রোগের প্রতিকার করে শিশুর জন্ম ত্রুটি এড়ানো যেতে পারে। গর্ভকালীন কিছু কিছু পরীক্ষা এবং আলট্রাসনোগ্রাম করে শিশুর অবস্থা ও কিছু কিছু রোগ নির্ণয় করা যায়। আর এ জন্য নিয়মিত প্রসূতির চেকআপের গুরুত্ব অনেক।

লেখক: কনসালট্যান্ট, নবজাতক ও শিশুরোগ বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন