শিশুর জন্য বুকের দুধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব মা, পরিবার ও রাষ্ট্রের

মায়ের নাড়িছেঁড়া সন্তান পৃথিবীর আলোয় আসার পর প্রথম ছয়টি মাস মায়ের বুকের দুধই তার একমাত্র খাবার। বৈজ্ঞানিক এ সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মায়ের দুধের মতো কার্যকর আর কিছুই নেই। শিশুর জন্য বুকের দুধ নিশ্চিত করা কেবল মায়েরই দায়িত্ব নয়, পরিবার এবং রাষ্ট্রকেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুর কল্যাণের জন্যই মায়ের যত্নও সুনিশ্চিত করতে হবে।

এমনই নানান বিষয় উঠে এলো মাদার’স হরলিক্স নিবেদিত ‘স্নেহের মাতৃত্ব’ অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে। বিষয় ছিল ‘ব্রেস্টফিডিংয়ে সমস্যা ও প্রতিকার’। অতিথি হিসেবে ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ) মাবিয়া  খাতুন ও ঢাকার ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা.  শারমিন সালাম। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা.  শ্রাবণ্য তৌহিদা। গত ২৯ আগস্ট অনুষ্ঠানটি একযোগে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে দর্শকদের কিছু প্রশ্নের জবাবও দেয়া হয়।

সন্তানের জন্মের পর একজন মায়ের জন্য তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়টা অত্যন্ত আনন্দের হলেও এ সময়ে একজন মা নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। এমনটাই জানালেন ডা. শারমিন সালাম। তাই একজন মায়ের আত্মবিশ্বাসী হবার কোনও বিকল্প নেই। প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য একফোঁটা পানিরও প্রয়োজন নেই, মায়ের দুধই যথেষ্ট। এই বিষয়টি মাকে যেমন বুঝতে হবে, তেমনি পরিবারের অন্যদেরও তা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এমনকি বাড়ির বাইরে যেতে হলেও যেন তিনি নিঃসংকোচে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আরামদায়ক একটি স্থান পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কর্মস্থল, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার – কোনো স্থানেই যেন শিশুকে খাওয়ানোর সময় হলে তিনি অস্বস্তিতে না পড়েন।
একজন মায়ের পারিপার্শ্বিকতা যে সন্তানের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, মাবিয়া খাতুন তা জানালেন নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার আলোকে। তাঁর কর্মস্থলে রয়েছে শিশুবান্ধব পরিবেশ। অন্যান্য স্থানে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক বলে মনে করেন তিনিও। কোনোভাবেই শিশুকে ‘ফর্মুলা মিল্ক’ অর্থাৎ কৌটাজাত দুধ দেবেন না, এ বিষয়ে প্রত্যয়ী ছিলেন তিনি। সমর্থন পেয়েছেন আপনজনদের কাছ থেকেও।

আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে শিশুকে খাওয়াতে হবে, শিশুকে বুকে ধরতে হবে নিয়মমতো। কেবল স্তনবৃন্ত নয়, বরং এর চারপাশের কালো অংশটিও যেন শিশুর মুখে থাকে, সেটি লক্ষ্য রাখতে হবে। শিশু শুধুমাত্র স্তনবৃন্ত থেকে দুধ টানতে চেষ্টা করলে সঠিক পরিমাণ দুধ নিঃসরণ হয় না। উপরন্তু স্তনবৃন্তে ব্যথা হতে পারে। ফলে মা নিজেও স্বস্তি পান না, আবার শিশুও ভোগে অপুষ্টিতে, তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
স্তন্যদানকারী মায়েদের পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে প্রতিদিন। প্রতিবার শিশুকে দুধ খাওয়ানোর আগে তিনি পানি খেতে পারেন। তাঁর খাদ্যতালিকায় দুধ, পেঁপে, লাউ এবং কালিজিরাসমৃদ্ধ কোনও খাবার রাখা ভালো। অনেকে ভাবেন, শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে না। কিন্তু দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতিটি ঠিক থাকলে এবং মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত হলে বারবার শিশুকে মায়ের স্তনে নিতে নিতেই ক্রমান্বয়ে দুধের প্রবাহ বাড়ে।

মায়ের স্তনে কোনও সমস্যা হলে চিকিৎসা করাতে হবে। একটি স্তনের সমস্যায় অপরটি থেকে শিশুকে খাওয়াতে হবে। এমনকি যে স্তনে সমস্যা হয়েছে, সেখান থেকে দুধ বের করে আলাদা পাত্রে নিয়েও শিশুকে খাওয়ানো যেতে পারে। এছাড়া শিশু কিংবা মায়ের কোনো মারাত্মক অসুস্থতার কারণে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো না গেলে স্তনে দুধ জমা হবার ফলে মায়ের অস্বস্তি হয়, এটিরও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। কোনো কারণে শিশু কৌটার দুধে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাকে মায়ের দুধে পুনরায় অভ্যস্ত করে তোলা সম্ভব বলেও জানা গেল আলোচনা থেকে।
প্রথম আলোর সাথে আয়োজিত মাদার’স হরলিক্স নিবেদিত ‘স্নেহের মাতৃত্ব’ অনুষ্ঠানটি অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে। কারন, এখানে এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে যা একজন নতুন মাকে সাহায্য করবে।