প্রশ্ন: আমি এক ছেলেকে ভালোবাসতাম। সে আমাকে কয়েকবার তার ঢাকার বাসায় নিয়ে গেছে। সেখানে সে একা থাকে। প্রতিবেশীরা জানত আমরা স্বামী-স্ত্রী। সে-ও আমাকে এ কথা বারবার বলেছে। এমনকি একবার হুজুর ডেকে মুখে মুখে আমাকে বিয়েও করেছিল। তবে কোনো কাগজে-কলমে নয়। এরপর অনেকবার আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতো থেকেছি। ঘুরতে গেছি কক্সবাজার, রাঙামাটি, সিলেটে।

হঠাৎ গত বছর আমার পেটে তার সন্তান আসে। এটা আমিও শুরুতে বুঝিনি। চার মাস পর বুঝতে পেরেছি। তাকে বলার পর সে গর্ভপাত করে ফেলতে বলে। তবে আমি সেটা করতে চাইনি। এই নিয়ে ঝগড়ার পর আমাদের বিচ্ছেদ হয়। সে আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখে না। শুনছি সে বিয়ে করবে। আমার সন্তান নিয়ে আমি একা থাকি। আমি কি কোনো আইনি সহায়তা পেতে পারি?

রুনু, ঢাকা

উত্তর: মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর বিধানমতে, প্রতিটি বিয়ে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত নিকাহ রেজিস্ট্রার সরকারের নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রতিটি বিয়ে এবং তালাকের পৃথক নিবন্ধন বজায় রাখেন। আপনাদের বিয়ে একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি না করে কোনো মাওলানা বা হুজুরের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। আইনে বলা আছে, মাওলানা বা হুজুরের মাধ্যমে, অর্থাৎ ধর্মীয় বিধান মেনে বিয়ে করা হলেও সে ক্ষেত্রে বিয়ে যেদিন হবে, সেদিন থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করবেন। কিন্তু আমরা অনেক ঘটনা দেখতে পাই, যেখানে পরে বিয়েটি আর নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা হয় না। বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার দায়িত্ব স্বামীর ওপর থাকে। কাজেই স্বামী বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে বা তাঁর দায়িত্ব পালন না করলে দুই বছর পর্যন্ত মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় শাস্তি হতে পারে। তবে বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে বিয়েটি অবৈধ হয়ে যাবে না।

কাবিননামা বা নিকাহনামা বিয়ের একমাত্র লিখিত প্রামাণ্য দলিল। বিয়েসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় এর প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে আপনার স্বামী যদি এই বিয়ে অস্বীকার করেন বা সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে আপনাকে বিয়ের ছবি কিংবা সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে বিয়ে প্রমাণ করতে হবে। সাক্ষী বা আপনাদের বিয়ে সম্পর্কে জানেন, এমন কোনো লোকের সাক্ষ্য বা বিয়েসম্পর্কিত যেকোনো তথ্য বা দলিল আদালতে দাখিল করে আপনি আপনার বিয়ে প্রমাণ করতে পারেন। এখানে দলিল বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো ছবি, ভিডিও, মেসেজ বা লিখিত অন্য কোনো দলিল ইত্যাদি, যা আপনাদের বিয়ের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আপনি বলেছেন আপনাদের প্রতিবেশীরা আপনাদের বিবাহিত হিসেবে জানত। কাজেই আপনি সাক্ষীদের মাধ্যমে বিয়েটি প্রমাণ করতে পারবেন বলে আশা করছি।

বিয়ে নিয়ে প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় বিয়ে হয়নি অথচ বিয়ে হয়েছে বলে মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করতে থাকেন। মেয়েটিকে আর ভালো না লাগলে কিংবা মেয়েটির সঙ্গে মতের অমিল বা মনোমালিন্য হলে ছেলেটি বিয়ে অস্বীকার করতে থাকে। দেশের প্রচলিত আইনে এ ধরনের ঘটনাগুলো অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

কাবিননামা সম্পন্ন না করে বিয়ে করে পরে তা অস্বীকার করলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ দণ্ডবিধির অধীনে ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নিতে পারে। দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন, তবে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তবে যদি ধর্মীয় মতে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আপনাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে এটি একটি বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিয়ে হয়েছে, তা প্রমাণ করা গেলে আপনি বৈধ স্ত্রী হিসেবে ভরণপোষণ পাবেন। সেই সঙ্গে আপনার সন্তান সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সে তার বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী হবে।

পাঠকের প্রশ্ন, বিশেষজ্ঞের উত্তর

পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে।

ই–মেইল ঠিকানা: [email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ডাক ঠিকানা: প্র অধুনা,

প্রথম আলো, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫। (খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’),

ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন