পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে অল্প বয়স থেকেই যে কাজগুলো করতে হবে
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি হঠাৎ একদিনে তৈরি হয় না; এটি দীর্ঘদিনের শারীরিক অবস্থা ও জীবনযাপনের ফল। এই ঝুঁকি কমাতে তরুণ বয়স থেকেই সঠিক জীবনধারা ও অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পড়ে যাওয়া (ফল) বৃদ্ধ বয়সের একটি পরিচিত সমস্যা। বৃদ্ধ বয়সে পড়ে যাওয়ার কারণে ফ্র্যাকচার বা হাড় ভাঙা, স্ট্রোক, মাথায় রক্তক্ষরণ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু জেনে রাখা উচিত এই ঝুঁকির বীজ কিন্তু রোপিত হয় অনেক আগেই—তরুণ বয়সে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোনজনিত পরিবর্তন, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং পেশিশক্তি হ্রাসের কারণে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই ঝুঁকি কমাতে তরুণ বয়স থেকেই সঠিক জীবনধারা ও অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
হাড়ের সুস্থতা
নারীদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয়ের প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। এর অন্যতম কারণ মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া। তাই কৈশোর ও তরুণ বয়সে হাড়ের ‘বোন ব্যাংক’ শক্তিশালী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ (কাঁটাসহ), ডাল, শাকসবজি ইত্যাদি রাখা উচিত। পাশাপাশি ভিটামিন ডির জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সূর্যালোকে থাকা প্রয়োজন। এতে শরীর ক্যালসিয়াম ভালোভাবে শোষণ করতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম
এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত ব্যায়াম। শুধু ওজন কমানোর জন্য নয়, বরং শরীরের ভারসাম্য, পেশিশক্তি ও নমনীয়তা বজায় রাখতে ব্যায়াম অপরিহার্য। হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার—এসব অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি স্কোয়াট, লাঞ্জ বা হালকা ভারোত্তোলনের মতো স্ট্রেংথ ট্রেনিং করলে পেশি ও হাড় আরও মজবুত হয়। এ ছাড়া যোগব্যায়াম, পিলাটেস বা ব্যালান্স এক্সারসাইজ শরীরের সমন্বয় ক্ষমতা বাড়ায়, যা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই ক্ষেত্রে আরেকটি মূল ভিত্তি। অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, ক্যাফেইন বা লবণ গ্রহণ শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বের করে দিতে পারে। ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ হাড়কে দুর্বল করে। তাই এসব অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত। পর্যাপ্ত প্রোটিন (ডিম, মাছ, মাংস, ডাল), ভিটামিন (বিশেষ করে ভিটামিন সি ও কে), এবং খনিজ (ম্যাগনেশিয়াম, জিংক) গ্রহণ শরীরের সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন হাঁটাচলায় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং জয়েন্টের ওপর চাপ বাড়ায়। আবার অনেক কম ওজন হাড়কে ভঙ্গুর করে তোলে। তাই সঠিক উচ্চতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা উচিত।
মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুম
মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা (রেসপন্স অ্যাবিলিটি) কমিয়ে দেয়। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ক্লান্ত থাকে, ফলে চলাফেরায় অসতর্কতা বাড়ে। তাই প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা জরুরি।
সঠিক দেহভঙ্গি ও দৈনন্দিন নিরাপত্তা অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা উচিত। যেমন হাঁটার সময় মোবাইল ব্যবহার না করা, ভেজা বা পিচ্ছিল জায়গায় সতর্ক থাকা, আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতা ব্যবহার এবং বাসা বা কর্মস্থলে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা। এই ছোট ছোট অভ্যাস ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি হঠাৎ একদিনে তৈরি হয় না; এটি দীর্ঘদিনের শারীরিক অবস্থা ও জীবনযাপনের ফল। তাই নারীদের জন্য তরুণ বয়সই হলো নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সেরা সময়। আজকের সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসই আগামী দিনের সুস্থ, নিরাপদ ও আত্মনির্ভর জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি