দুবার ক্যানসার জয় করা রায়না মাহমুদের দুঃসহ দিনের গল্প
একবার সেরে উঠতে না উঠতেই আবার বুকে বাসা বাঁধে ক্যানসার। আবার শুরু হয় কঠিন চিকিৎসা। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে এখন সুস্থ রায়না মাহমুদ। তাঁর দুঃসহ দিনের গল্প শোনাচ্ছেন সুরাইয়া সরওয়ার
কলিং বেল বাজাতে গিয়ে ‘চঞ্চল মাহমুদ’ নামটা চোখে পড়ল। দরজায় লেখা। ঢাকার গ্রিন রোডের বাসায় প্রয়াত এই ফ্যাশন আলোকচিত্রীর স্ত্রী রায়না মাহমুদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
হাসিমুখে দরজা খুললেন রায়না মাহমুদ। ভেতরে ঢুকতেই দেখি, বসার কক্ষের এক পাশে একগাদা নতুন পোশাক আর নানা নকশার গয়না রাখা। আমার দৃষ্টি সেসবে পড়তেই বললেন, ‘এসব আমার বুটিক হাউসের পণ্য। এখন এই বুটিক নিয়েই থাকি।’
তাঁর নামেই বুটিক হাউসের নাম ‘রায়নাস ক্রিয়েশন’। বললেন, ‘নামটা তোমার চঞ্চল ভাইয়ের দেওয়া।’
কুশল বিনিময়ের পর আমাদের আলাপ অবশ্য অন্য বিষয়ে শুরু হয়। সেটা রায়না মাহমুদের জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম দিনগুলোর করুণ গল্প।
এটা কি টিউমার
স্তনে অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ডের আঁচ পেয়ে আনমনে বলে উঠলেন রায়না মাহমুদ। বয়স হয়েছে, এসব হেলাফেলা করা উচিত না। চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিল মায়ের স্মৃতি। এই স্তন ক্যানসারেই তো মারা গেছেন মা। এই ক্যানসারে পারিবারিক ঝুঁকি থাকে, জানেন রায়না। তাই দ্রুতই রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে গেলেন। সার্জারি করে টিউমারটা বের করে বায়োপসি করতে দিলেন চিকিৎসক। বায়োপসিতে জানা গেল, ক্যানসার।
পারিবারিক ইতিহাস থাকার পরও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না রায়না মাহমুদ। ভাবলেন, ভুলও তো হতে পারে। আবার পরীক্ষা করালেন। দ্বিতীয়বারও জানা গেল, ক্যানসার পজিটিভ, দ্বিতীয় ধাপ। জরুরি অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক।
বললেই তো আর ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করা যায় না। বিশাল অঙ্কের অর্থ দরকার। চারবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে চঞ্চল মাহমুদও তখন ঘরবন্দী। তাঁর ডায়াবেটিস আশঙ্কাজনক। নিজেদের সঞ্চয় বলতেও কিছু নেই। সরকার ও প্রিয়জনদের কাছে দুজনের চিকিৎসার সহযোগিতা চাইলেন চঞ্চল মাহমুদ। পাশে দাঁড়ালেন বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শুরু হলো রায়না মাহমুদের চিকিৎসা।
প্রথম কেমোথেরাপির তিন সপ্তাহ পর নিলেন দ্বিতীয়টা। রেডিয়েশন থেরাপিও শুরু হলো। দ্বিতীয় কেমোথেরাপি দেওয়ার পর আয়নায় নিজেকে দেখে চোখের পানি লুকিয়েছেন রায়না মাহমুদ। বললেন, ‘সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়। সেই সময়ের কথা মনে হলে এখনো আমার হাত-পা কাঁপে।’
দ্বিতীয় কেমো নেওয়ার পর থেকে চুল পড়তে শুরু করল। ঘন আর লম্বা চুলে হাত দিলেই মুঠোভর্তি করে উঠে আসত। রায়না মাহমুদ বলেন, ‘মনে হতো কেউ যেন শিকড়সহ গাছ উপড়ে ফেলছে। একে একে ভ্রু, চোখের পাপড়িও পড়ে গেল। হাত কালো হয়ে গেল। মনে হতো, আমার হাত দুটো কে যেন পুড়িয়ে দিয়েছে।’
সেই কষ্ট চেপেই এগোতে থাকে রায়না মাহমুদের চিকিৎসা। ২১ দিন পরপর কেমো নিতে হতো। একে একে ছয়টা নিলেন। সে কী যন্ত্রণা! সহযোগীর মতো পাশে থাকেন চঞ্চল মাহমুদ। থাকেন সন্তানেরা। হাসপাতালে কখনো তিন সন্তানের একজনকে সঙ্গে নিতেন, কখনো একাই যেতেন। করোনার ঘরবন্দী সময়ে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থাটুকু নিজেই করে নিতেন রায়না মাহমুদ।
এত সবের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটটাও ভাবাত। রায়না মাহমুদ বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। ক্যানসার শুধু শারীরিক আর মানসিক কষ্টই দেয় না, এর সঙ্গে থাকে চিকিৎসার বিরাট খরচের চিন্তা। প্রতিটি কেমো দিতে খরচ ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা। করোনার কারণে কাজ বন্ধ। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা চালিয়ে নেব কী করে, এ নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না।’
সে সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী। এই মানুষদের প্রতি রায়না মাহমুদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
দুঃসময় যেন কাটে না
২০২১ সালে রায়না মাহমুদের কেমোথেরাপি চলার সময়ই লাইফ সাপোর্টে চলে যান চঞ্চল মাহমুদ। কেমো নিয়ে স্বামীর পাশে বসে থাকতেন। চোখ মুছে রায়না বলেন, ‘জানো, একটা সিনেমায় দেখেছিলাম লাইফ সাপোর্টের রোগীরা আমাদের সব কথা শুনতে পায়। ওর (চঞ্চল মাহমুদ) পাশে বসে পবিত্র কোরআন শরীফ পড়ে ওকে ফুঁ দিতাম। বসে বসে গল্প করতাম যে তুমি আবার সুস্থ হয়ে যাবা। আমরা আবার অফিস করব। আবার তুমি ফটোশুট করবা।’
চঞ্চর মাহমুদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু রায়না রাজি হননি। ১৭ দিন আইসিইউতে কাটানোর পর দেখা গেল, চঞ্চল মাহমুদ একটু একটু করে হাত নাড়ছেন। রায়না মাহমুদ ছুটে গিয়ে চিকিৎসকদের ডেকে আনলেন। সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। সুস্থ হয়ে উঠলেন চঞ্চল মাহমুদ। রায়না মাহমুদেরও ৩৩টা কেমো শেষ হলো। আবার যেন তাঁদের সুন্দর দিন ফিরে এল।
ক্যানসার আবার ফিরে এল
এই ভালো সময় বেশি দিন স্থায়ী হলো না। আট মাস পর আবার রায়না মাহমুদের স্তনে টিউমার ধরা পড়ল। পরীক্ষা করে জানা গেল, ক্যানসার আবার ফিরে এসেছে। ‘শুনেছিলাম, অনেকের ১০-১৫ বছরেও ক্যানসার ফিরে আসে না। আমার হয়তো ভাগ্যটাই খারাপ,’ বলেন রায়না।
চিকিৎসা শুরু হলো। তবে এবার কেমোথেরাপি নিতে হলো না। ১৬টি রেডিয়েশন থেরাপির পর ক্যানসার দূর হলো। তবে ওষুধ চালিয়ে যেতে হলো। এর মধ্যে কিছু ওষুধ খেতে হবে আজীবন।
দেয়ালজুড়ে স্মৃতি
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চঞ্চল মাহমুদের স্ট্রোক করে। কথা বন্ধ হয়ে যায়, অবশ হয়ে যায় ডান হাত-পা। যে মানুষটা সারা দিন গল্প করতেন, সেই মানুষটা আর কথা বলতে পারতেন না। এভাবেই মাস ছয়েক ভুগে ২০ জুন মারা যান চঞ্চল মাহমুদ।
বাসার দেয়ালজুড়ে এই দম্পতির নানা সময়ের ছবি। কোনটা কোন সময়ে তোলা, ছবিগুলো দেখিয়ে বললেন রায়না মাহমুদ। চঞ্চল মাহমুদের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন গ্রিন রোডের বাসায় একাই থেকেছেন রায়না মাহমুদ। খুব একা লাগত বলে একজন মেয়েকে এক রুমে থাকতে নিয়েছেন। বললেন, ‘বাসার সবখানে ওর (চঞ্চল মাহমুদ) স্মৃতি। মনে হয়, এই বাসা ছেড়ে গেলে পাগল হয়ে যাব। তাই এই বাসা ছাড়তে পারি না।’
*প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন ‘বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫’–এ প্রকাশিত