স্কুল ছুটির পর যে কারণে শিশুকে রাস্তার খাবার দেবেন না

স্কুল ছুটির পর অনেক শিশুর পাশের ভ্যান বা দোকানের সামনে থেকে হাতে তুলে নিচ্ছে শিঙাড়া, সমুচা, ফুচকা, চটপটি, বার্গার, নুডলস কিংবা ফ্রায়েড চিকেন। কিন্তু কীভাবে এই অভ্যাস থেকে শিশুকে মুক্ত করবেন?

স্কুলগেটের পাশের ভ্যান বা দোকানের খাবার শিশুর জন্য স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে
ছবি: প্রথম আলো

স্কুল ছুটির সময় যেকোনো স্কুলগেটের সামনে তাকালেই দৃশ্যটা চোখে পড়ে। শিশুরা অভিভাবকের হাত ধরে বের হয়ে গেটের পাশের ভ্যান বা দোকানের খাবার খাচ্ছে।অনেক সময় অভিভাবকেরাও সন্তানের সঙ্গে এসব খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু এই অভ্যাস শিশুর পাশাপাশি অভিভাবকের স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে।

খিদে নয়, সমস্যা প্রস্তুতির অভাবে

স্কুলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাটানোর পর শিশুর ক্ষুধা লাগা স্বাভাবিক। অনেক শিশু টিফিনের পুরোটা খায় না, কেউ খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে, কেউ আবার পুরো টিফিনই ফেরত নিয়ে আসে। অনেকে আবার সকালের নাশতা না খেয়েই স্কুলে যায়। স্কুল ছুটির সময় তাই শিশুদের খিদে পাওয়া স্বাভাবিক। সেই মুহূর্তে সামনে যা পাওয়া যায়, সেটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়।

রাস্তার খাবার সহজলভ্য, সুগন্ধযুক্ত ও মুখরোচক হওয়ায় শিশুরা দ্রুত সেদিকে আকৃষ্ট হয়। আর ফেরিওয়ালা বা ফাস্টফুডের দোকানদারেরাও এই মানসিকতা জানে বলেই স্কুলের চৌহদ্দিতেই দোকান খুলে বসেন। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু শিশুর খাবার বেছে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধার সময় হাতের কাছে একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প না থাকাও এর অন্যতম কারণ।

আরও পড়ুন
বাচ্চার টিফিনে বাড়িতে বানানো খাবার দিতে হবে
ছবি: প্রথম আলো

নিয়মিত রাস্তার ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড খাওয়া কেন উদ্বেগের বিষয়

অতিরিক্ত তেল ও ক্যালরি: শিঙারা, সমুচা ও ফ্রায়েড চিকেনের মতো গভীর তেলে ভাজা খাবারে তুলনামূলক বেশি ক্যালরি থাকতে পারে। একই তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তেলের গুণমান নষ্ট হতে পারে, তৈরি হতে পারে ক্ষতিকর যৌগ। নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা যুক্ত হলে অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি বাড়ে।
পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা: এসব খাবারে যে পুষ্টি একেবারেই নেই তা নয়। তবে নিয়মিত এসবের ওপর নির্ভর করলে ফল, সবজি, ডাল, দুধ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের হার কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ভাজাপোড়া খেলে পেট ভরে যায়। আর খিদেও পায় না। ফলে পরবর্তী খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত লবণ ও চিনি: ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস, কিছু সস ও কোমল পানীয়ে অতিরিক্ত লবণ বা চিনি থাকতে পারে। দীর্ঘদিন এমন খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পথে বাধা হতে পারে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত, আর অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় দাঁতের ক্ষয় এবং অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি: খোলা পরিবেশে তৈরি বা অনিরাপদভাবে সংরক্ষিত খাবার ধুলাবালু, মাছি, দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন হাতের মাধ্যমে জীবাণু দ্বারা দূষিত হতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। তাই খাবারটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
দাঁতের স্বাস্থ্য: ঘন ঘন মিষ্টি খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলে দাঁতে ক্যাভিটি বা ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। শিশুর ছোটবেলা থেকেই দাঁতের যত্ন ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

রাস্তার খাবার সহজলভ্য, সুগন্ধযুক্ত ও মুখরোচক হওয়ায় শিশুরা দ্রুত সেদিকে আকৃষ্ট হয়
ছবি: প্রথম আলো

বদলাতে হবে বড়দেরও

শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। অভিভাবক নিয়মিত ভাজাপোড়া বা ফাস্টফুড খেলে শিশুর কাছে সেটি স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে পরিবারের সবাই যদি ফল, সবজি ও ঘরে তৈরি খাবারকে প্রাধান্য দেন, তাহলে শিশুরও সেদিকে আগ্রহ বাড়তে পারে।

এ ধরনের খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কেবল নিষেধ করলেই হবে না, শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে। শিশুর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য গোটা পরিবারের খাদ্যাভ্যাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
শিশুর টিফিন বক্সে থাকুক স্বাস্থ্যকর খাবার
ছবি: প্রথম আলো

যেভাবে মিলবে সমাধান

স্কুল ছুটির পরের ক্ষুধা সামলাতে ব্যাগে আগে থেকেই পুষ্টিকর স্ন্যাক্স রাখা যেতে পারে। মা–বাবা নিজেরাও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন ছুটির সময়। যেমন—
১. কলা, পেয়ারা, আপেল বা অন্য কোনো মৌসুমি ফল।
২. সেদ্ধ ডিম, ভাজা ছোলা বা পরিমিত পরিমাণ বাদাম।
৩. ডিম, সবজি বা মুরগি দিয়ে ঘরে তৈরি ছোট স্যান্ডউইচ কিংবা রুটি-রোল।
৪. মুড়ি, ছোলা ও বাদামের মিশ্রণ।
৫. চিড়া, দই ও কলার মিশ্রণ।
খাবার বহনের সময় পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে ডিম, দই, মুরগি বা অন্য পচনশীল খাবার দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা উচিত নয়। শিশুর সঙ্গে পানির বোতল দেওয়াও জরুরি। নিয়মিত কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়র পরিবর্তে সাধারণ পানিকে প্রাধান্য দিন।

নাজনীন এস মৌসুমী, সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান ও বিভাগীয় প্রধান, নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়াবেটিস ডিপার্টমেন্ট, প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জ

আরও পড়ুন