দুর্ঘটনার পর কাছের মানুষদের করণীয়
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা দিতে আমরা কী করব এবং কী করা থেকে বিরত থাকব, তা জেনে নেওয়া যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার-এর কাছ থেকে।
যেকোনো দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা ভয়, আতঙ্ক, অপরাধবোধ, কষ্ট, রাগ, হতাশা, অসহায়ত্বসহ নানা রকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান। এ সময় কাছের মানুষদের (পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব) কাছ থেকে মানসিক সহায়তা খুব প্রয়োজন হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উপদেশ, দয়া, করুণা, সহানুভূতি—এগুলোর চেয়ে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির কষ্ট কমাতে সমানুভূতি বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সমানুভূতি হলো আরেকজনের আবেগ-অনূভূতি ও চাওয়াগুলোকে বুঝে সাধ্যের মধ্যে সহযোগিতার হাত বাড়ানো।
কিন্তু অনেক সময় আমরা নিজের অজান্তেই কষ্টে থাকা ব্যক্তিকে সমানুভূতির পরিবর্তে উপদেশ দিয়ে ফেলি, পরিস্থিতি বা তার কষ্টকে তুচ্ছ করি অথবা তাকে দোষারোপ করি, যা সেই ব্যক্তির মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা দিতে আমরা কী করব এবং কী করা থেকে বিরত থাকব, তা জেনে নেওয়া যাক।
যা করবেন
মনোযোগ ও আন্তরিকতা দিয়ে শুনুন
সাধারণত বিপদ কেটে যাওয়ার পরও আক্রান্ত ব্যক্তি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা তাঁর মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকে এবং ভেতরে–ভেতরে দমবন্ধ বোধ করেন। এ সময় এমন একজন শ্রোতা প্রয়োজন হয়, যিনি আন্তরিকভাবে শুনবেন।
অন্যের বিপদে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে চাইলে সবার আগে সেই বিশ্বস্ত ও আন্তরিক শ্রোতা হওয়া জরুরি। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি কিছু বলতে চাইলে বলার সুযোগ দিন। প্রয়োজনে কথার মাঝে ‘আমি আছি’, ‘আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি’ বলে আশ্বস্ত করুন।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বললে মানুষ হালকা বোধ করেন এবং সমাধানের জন্য মস্তিষ্ক প্রস্তুত হতে শুরু করেন।
অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
কষ্ট যিনি বহন করেন, তিনিই জানেন এর ভার কেমন। তাঁর কষ্টকে আপনার কাছে হালকা মনে হলেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সুযোগ নেই। কথা শোনার সময় আপনার দৃষ্টি বা অঙ্গভঙ্গিতে সম্মান ও আন্তরিকতা রাখুন। তাঁকে অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিন। এতে তিনি বুঝবেন, তাঁর আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থির হতে সাহায্য করুন
কথা বলার সময় কান্নকাটি করলে নীরবে তাঁর পাশে থাকুন। আপনার সাধ্য অনুযায়ী তাঁর জন্য নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন। ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে বলুন (৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৬ সেকেন্ডে ছাড়ুন)। আপনিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিন। আশ্বাস দিন, ‘এ মুহূর্তে তুমি নিরাপদ, আমি তোমার পাশে আছি।’
কী প্রয়োজন, জিজ্ঞেস করুন
মানসিক সহায়তা ছাড়াও অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন আছে কি না, খেয়াল করুন। প্রয়োজনে জিজ্ঞেস করুন। যেমন ‘তুমি কিছু খেয়েছ?’, ‘তুমি চাইলে আমি তোমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে পারি।’ এতে তিনি ভরসা পান এবং নিজেকে একা মনে করেন না।
মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তার জন্য উৎসাহিত করুন
তীব্র হতাশা, মানসিক যন্ত্রণা, আত্মহননের চিন্তা থাকলে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যাপারে তথ্য দিন, সেবা গ্রহণের জন্য উৎসাহ ও সাহস দিন।
যা করা থেকে বিরত থাকবেন
কথা বলার জন্য পীড়াপীড়ি করা
আপনি যাঁকে সহযোগিতা করতে চাইছেন, তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে আড়ষ্ট বোধ করলে কথা বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন। হয়তো নিজেকে প্রকাশের জন্য তিনি প্রস্তুত নন, সময় প্রয়োজন। তাই নীরবে তাঁর পাশে থাকুন।
থামিয়ে দেওয়া
অনেক সময় আমরা মনে করি, কষ্টের কথা বললে কষ্ট আরও বাড়ে। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। আমরা আবেগ প্রকাশের সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত নই, তাই এমনটা মনে হয়। কেউ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে চান, তাহলে তাঁকে থামিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
‘আরে বাদ দাও, এত কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই’, ‘কাঁদছ কেন, শক্ত হও’—এ ধরনের কথা বরং মনোকষ্ট বাড়ায়।
উপদেশের বন্যা বইয়ে দেওয়া
যাঁকে সহায়তা করতে চাইছেন, তিনি আপনার উপদেশ চাইছেন কি না, খেয়াল করুন। উপদেশ না চাইলে আগ বাড়িয়ে উপদেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ‘তোমার আরও সাবধান থাকা উচিত ছিল’, ‘এখান থেকে শিক্ষা নাও যেন ভবিষ্যতে আর ভুল না হয়’—এ ধরনের কথা বিরক্তি ও হতাশা বাড়ায়।
তুলনা করা
‘অমুকের পরিস্থিতি তো আরও খারাপ ছিল, তবু সামলে নিয়েছে’, ‘আমি হলে এত ভেঙে পড়তাম না’—এ ধরনের তুলনা অপ্রয়োজনীয় এবং নিষ্ঠুর। তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন।
দোষারোপ করা
আপনি যদি সত্যিই পাশে থাকতে চান, তাহলে ভুক্তভোগীকে তাঁর দুরবস্থার জন্য দায়ী করা থেকে বিরত থাকুন। দোষারোপে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ে।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাউকে সহায়তা করতে চাইলে চট করে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা নয়; বরং ‘আমি আছি’—এ বার্তাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা।