সংযমে হোক নীরোগ জীবন

ছবি: কবির হোসেন

রমজান মানেই আধ্যাত্মিক সাধনা আর পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু এই সাধনা পূর্ণতা পায় তখনই, যখন শরীর ও মন সুস্থ থাকে। অথচ আমাদের দেশে রমজান এলেই ইফতার ও সাহ্‌রিতে ভাজাপোড়া আর অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবারের যে উৎসব শুরু হয়, তাতে সুস্থতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন করলে রমজান হতে পারে সারা বছরের সুস্থতার চাবিকাঠি।

দেহযন্ত্রের ‘সুরক্ষা’

সারা বছর আমাদের পরিপাকতন্ত্র বিরতিহীনভাবে কাজ করে। দীর্ঘ এক মাস দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত থাকার ফলে পাকস্থলী ও যকৃৎ বিশ্রাম পায়। এ সময় শরীরে জমে থাকা টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানগুলো বেরিয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডিটক্সিফিকেশন’। কিন্তু আমরা যদি ইফতারে ডুবোতেলে ভাজা পেঁয়াজু-বেগুনি আর সাহ্‌রিতে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তবে এই প্রাকৃতিক নিরাময়প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

ইফতার হোক প্রশান্তির

সারা দিন পানি না খাওয়ার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই ইফতার শুরু করা উচিত পর্যাপ্ত পানি ও কয়েকটি খেজুর দিয়ে। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ও পটাশিয়াম তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ইফতারে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবতের বদলে ডাবের পানি, ইসবগুলের ভুসি বা লেবুর শরবত বেছে নেওয়া ভালো। জিলাপি বা হালিমের মতো গুরুপাক খাবারের বদলে চিড়া-দই বা ফলমূল খেলে পাকস্থলীর ওপর চাপ কম পড়ে। মনে রাখতে হবে, ইফতারের লক্ষ্য পেট ভরে ফেলা নয়, বরং দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার পর শরীরকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া।

সাহ্‌রি: সারা দিনের জ্বালানি

অনেকেই অলসতা করে সাহ্‌রি না খেয়ে রোজা রাখেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সাহ্‌রিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত, যা ধীরে ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়। লাল চালের ভাত, প্রচুর সবজি, ডাল এবং প্রোটিন হিসেবে মাছ বা মুরগি উপযুক্ত। সাহ্‌রিতে আঁশযুক্ত খাবার বেশি থাকলে সারা দিন তৃষ্ণা ও ক্ষুধার উদ্রেক কম হয়। বিশেষ করে সাহ্‌রির সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি, তবে তা একবারে না খেয়ে ইফতার থেকে সাহ্‌রি পর্যন্ত অল্প অল্প করে পান করা শ্রেয়।

মানসিক সুস্থতা ও বিশ্রাম

রমজানের সুস্থতা কেবল খাবারের ওপর নির্ভর করে না। পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তিও এর অংশ। সাহ্‌রি খাওয়ার জন্য রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তাই দুপুরের দিকে সম্ভব হলে অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নেওয়া উচিত। রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরনিন্দা থেকে দূরে থাকার যে শিক্ষা রমজান দেয়, তা উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপ কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

সুস্থতা রমজানের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটাই হওয়া উচিত অন্যতম লক্ষ্য। সুন্নাহ ও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে যদি আমরা পরিমিতিবোধ বজায় রাখতে পারি, তবেই রমজান শেষে আমরা পাব একটি রোগমুক্ত শরীর ও সতেজ মন। ভাজাপোড়া আর অপচয় ছেড়ে সহজ ও পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাসই হোক এবারের রমজানের অঙ্গীকার।

খাদ্য–পরিকল্পনা ও হাইড্রেশন

রমজানে সুস্থ থাকার প্রধান শর্ত হলো সাহ্‌রি ও ইফতারের সুষম খাদ্যতালিকা।

সাহ্‌রি: সাহ্‌রি কখনো বাদ দেবেন না এবং এটি যতটা সম্ভব দেরিতে খাওয়া সুন্নত। সাহ্‌রিতে ‘কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট’ বা জটিল শর্করা যেমন লাল আটার রুটি, ব্রাউন রাইস বা ওটস রাখা উচিত। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন (ডিম, মাছ বা ডাল) এবং আঁশযুক্ত সবজি দীর্ঘ সময় শরীরে শক্তি জোগাবে

ইফতার: ইফতার শুরু করা উচিত খেজুর ও পানি দিয়ে। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত বা বাজারের রঙিন পানীয়র বদলে লেবুপানি বা চিনি ছাড়া তাজা ফলের রস বেছে নিন। ভাজাপোড়া যেমন বেগুনি, পেঁয়াজু বা আলুর চপ পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে, তাই এগুলো কমিয়ে সালাদ ও ফল বেশি খান।

হাইড্রেশন: ইফতার থেকে সাহ্‌রি পর্যন্ত দুই থেকে তিন লিটার পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। তবে একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে বিরতি দিয়ে অল্প অল্প করে খাওয়া ভালো। ক্যাফেইন–জাতীয় পানীয় (চা-কফি) কম পান করা উচিত, কারণ এগুলো শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের সময়সূচি পরিবর্তন করে নিলে রমজানের মাসটি হবে প্রশান্তিময় ও স্বাস্থ্যকর।