যেভাবে দূষিত খাবার ও পানি থেকে ছড়াচ্ছে হেপাটাইটিস

পথের খাবার থেকে হেপাটাইটিস ভাইরাসের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারেমডেল: বাপ্পা শান্তনু, ছবি: সুমন ইউসুফ

আমাদের চারপাশের পরিবেশ, বিশেষ করে খাবার ও পানিতে ছড়িয়ে রয়েছে হেপাটাইটিস ভাইরাসের জীবাণু। সামান্য অসতর্কতায় সেখান থেকে হয়ে যেতে পারে জন্ডিস। বাংলাদেশে যত মানুষ জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় তার ৩৭ শতাংশই পানিবাহিত হেপাটাইটিস ই থেকে। আর পানিবাহিত আরেক ভাইরাস হেপাটাইটিস এ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রায় ২৭ শতাংশকে আক্রমণ করে থাকে।

বাংলাদেশে এত উচ্চ সংক্রমণের কারণ কী

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস এ এবং ই-র উচ্চ সংক্রমণের হার বিদ্যমান। বছরজুড়ে হলেও সাধারণত গরমকাল ও বর্ষাকালে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। সেটার কিছু কারণ আছে—

১. বর্ষাকালে প্রায়ই শহরগুলোয় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তখন স্যুয়ারেজের লাইন ও শহরের পানি সরবরাহের পাইপলাইন প্রায়ই মিলেমিশে যায়। কখনো স্যুয়ারেজের লাইন লিক করে দূষিত পানি পরিবেশে মিশে যায়। এই দূষিত পানি পান, রান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারের সময় ঝুঁকি বেড়ে যায়।

২. গরমে বাইরে কাজ করা মানুষের মধ্যে রাস্তায় বিক্রি হওয়া অনিরাপদ পানি, শরবত, আখের রস, লেবুপানি ইত্যাদি পানের প্রবণতা বাড়ে। এই অনিরাপদ পানি ও পানীয় থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে।

৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশে এমনিতেই নাজুক। বর্ষার দিনে রাস্তাঘাটের আবর্জনা পানিতে মিশে গিয়ে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

৪. ঘনবসতি এবং বস্তি বা দরিদ্র এলাকায় স্যানিটারি টয়লেটের অভাবও এই রোগ ছড়ানোর একটি বড় কারণ।

সাধারণ জন্ডিস কি গুরুতর হয়

অনেকেরই ধারণা হেপাটাইটিস এ এবং ই থেকে মারাত্মক কোনো পরিণতি হয় না। বড়জোর জন্ডিস হতে পারে, যা আবার তেমন কোনো চিকিৎসা ছাড়াই একসময় সেরে যায়। এই ধারণা ভুল।

কিছুদিন আগেই হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় একজন তারকার মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ে হেপাটাইটিস ই সংক্রমণে লিভার ফেইলিউর করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর একটি অন্যতম ঝুঁকি হয়ে উঠছে এই গর্ভকালীর জন্ডিস বা হেপাটাইটিস ই সংক্রমণ।

কীভাবে সতর্ক হবেন

কোনো পরিস্থিতিতেই বাইরের খোলা ও অনিরাপদ পানীয় পান করা যাবে না
মডেল: বাপ্পা শান্তনু, ছবি: সুমন ইউসুফ
  • বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই। কোনো পরিস্থিতিতেই বাইরের খোলা ও অনিরাপদ পানি পান করা যাবে না। বাইরে গেলে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি বহন করার অভ্যাস করুন।

  • বাড়িতে পানি ভালো করে ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করে পরিষ্কার পাত্রে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সময় যেমন বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সময় প্রয়োজনে ধোয়াধুয়ি ও শাকসবজি, ফলমূল ধোয়ার কাজেও ফোটনো পানি ব্যবহার করতে হবে।

  • রাস্তায় ভ্যানে বিক্রি হওয়া লেবুর শরবত, আখের রস, বরফপানি, ফুচকার টক পানি হেপাটাইটিস ছড়ানোর অন্যতম উৎস। রেস্তোরাঁগুলোয় দূষিত পানি দিয়ে প্লেট–গ্লাস ধোয়া, সালাদ বা কাঁচা জিনিস অনিরাপদ পানিতে ধুয়ে অনেক সময় পরিবেশন করা হয়। এ বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

  • আজকাল অনেকেই বিভিন্ন কোম্পানির সাপ্লাই দেওয়া বড় জারের পানি পান করে থাকেন। এগুলোর বিশুদ্ধতা বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

  • বন্যাদুর্গত স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ বা দরকার হলে ক্লোরিন বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পানি বিশুদ্ধকরণ কার্যক্রম চালু করতে হবে।

  • ছোটবেলা থেকেই শিশুদের খাবার গ্রহণের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও অন্যান্য হাইজিন শেখাতে হবে। স্কুলপর্যায়ে হাইজিন শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন