বড়দেরও কি নিয়মিত কৃমির ওষুধ প্রয়োজন

আমাদের দেশে শিশু–কিশোরদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। কৃমি সংক্রমণের কোনো উপসর্গ না থাকলেও কেবল প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবেই তাদের দেওয়া হয় এই ওষুধ। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেও তো কেউ কেউ ভোগেন কৃমির সমস্যায়। তাহলে কি সব বয়সেই কৃমি প্রতিরোধে ওষুধ খাওয়া জরুরি? স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মেডিসিন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন
ছবি: পেক্সেলস

কৃমি এবং অন্যান্য বহু জীবাণু প্রতিরোধের উপায় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন এবং খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসের বিকল্প নেই। বাসনকোসন ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া এবং কাঁচা খাওয়া যায়—এমন খাবার ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়াও জরুরি।

শৌচকর্মের পর ভালোভাবে হাত ধোয়ার গুরুত্বও সবারই জানা। খালি পায়ে মাটিতে হাঁটলে কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এ ব্যাপারও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

শিশু–কিশোরদের জন্য কেন বাড়তি সতর্কতা

সব বয়সেই কৃমি প্রতিরোধের জন্য এসব বিষয় মেনে চলা উচিত। তবে বাস্তবতা হলো, শৈশব-কৈশোরে স্বাস্থ্যরক্ষার অনেক দিক সব সময় মেনে চলা সম্ভব না-ও হতে পারে। ঘাসের ওপর দৌড়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য সুন্দর অনুভূতি থেকে আপনিও নিশ্চয়ই আপনার সন্তানকে বঞ্চিত করতে চাইবেন না।

কিন্তু বাড়ন্ত বয়সের আনন্দের মধ্যে পুষ্টিহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে কৃমি। পুষ্টির ঘাটতিতে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে প্রতিবছর নিয়মমাফিক তাদের কৃমির ওষুধ খাওয়ানোই ভালো। বড়দের জন্য আলাদাভাবে এমন নিয়ম নেই।

আরও পড়ুন

বড়দের মধ্যে কারা নেবেন কৃমির ওষুধ

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের কৃমি সংক্রমণ ও সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি, সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলেও তাঁদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খেতে বলা হয়।

বাকিদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলে কৃমির ওষুধ তেমন প্রয়োজনীয় নয়। জেনে নিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বড়দের মধ্যে কারা আছেন ঝুঁকিতে।

  • যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম (যেমন ৬৫ বছর পেরোনো ব্যক্তি, কেমোথেরাপি বা দীর্ঘ মেয়াদে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তি)

  • খালি পায়ে মাটিতে হাঁটেন বা কাজ করেন, এমন ব্যক্তি (যেমন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি)

  • গর্ভধারণ করতে সক্ষম, এমন নারী (গর্ভাবস্থায় নয়)

  • যে এলাকায় কৃমির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেই এলাকায় বসবাসরত যেকোনো বয়সী নারী-পুরুষ (কখনো কখনো সরকারি উদ্যোগেও কোনো এলাকার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর কর্মসূচি হতে পারে)

একটি ওষুধ খেলেই চলবে?

সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। তবে আমাদের দেশে যেসব কৃমির প্রাদুর্ভাব আছে, সেসব প্রতিরোধ করতে এরই সঙ্গে আরেকটি ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন। ওষুধটির নাম আইভারমেকটিন।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওজনের ওপর নির্ভর করে আইভারমেকটিনের ডোজ নির্ধারণ করতে হয়। প্রতি কেজি ওজনের জন্য ২০০ মাইক্রোগ্রাম। তাই সঠিক ডোজ জেনে নিতে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

কখন খাওয়া ভালো

দিনে নাকি রাতে, খাওয়ার আগে নাকি পরে—কখন কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো, এ নিয়ে দ্বিধায় পড়বেন না। আপনি নিজের সুবিধামতো সময়েই কৃমির ওষুধ খেতে পারেন। তবে যেকোনো দুই বেলার খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো।

এক বেলার খাবার খাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা পর খেতে পারেন, যার দু–এক ঘণ্টা পর আরেক বেলার খাবারের সময় হয়ে যায়। অনেকে আবার রাতে কৃমির ওষুধ খান। মৃদু কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেই সময় বিশ্রাম নিলে তা উপশম হতে পারে। রাতে কৃমির ওষুধ খাওয়ার কোনো আলাদা উপকারিতা নেই।

আরও পড়ুন

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা থাক

কৃমির ওষুধ খাওয়ার পর সাধারণ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—

  • বমি ভাব

  • বমি

  • পেটে হালকা ব্যথা

  • পাতলা পায়খানা

  • মাথা ঘোরানো

  • মাথাব্যথা

  • একটু ঘুম ভাব

  • মৃদু বা মাঝারি জ্বর

  • পেশিতে হালকা ব্যথা

তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—

  • তীব্র পেটব্যথা

  • চোখ বা প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া

  • ত্বকে গোটা সৃষ্টি হওয়া

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের কৃমি সংক্রমণ ও সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি, সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলেও তাঁদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খেতে বলা হয়
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই খেয়াল রাখুন

  • গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ খেতে নেই। কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে ও পরে (এক মাস পর্যন্ত সময়) গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। এমনকি গর্ভধারণ হয়েছে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

  • কোনো কৃমির ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়া যাবে না।

  • অন্য কোনো ওষুধ চলমান থাকলে বা কোনো রোগের উপসর্গ থেকে থাকলে কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ওষুধ খাওয়ার আগেই কৃমি সংক্রমণ হয়ে থাকলেও ভিন্ন ডোজ বা ভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

  • যে মা সন্তানকে দুধ খাওয়ান, তাঁর ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রয়োজন।

আরও পড়ুন