সপ্তাহে একবার যে ওষুধ গ্রহণে ওজন কমে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জানুন

সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ওজন কমানোর সাপ্তাহিক ওষুধ। আদতেই কি এ ধরনের ওষুধ ওজন কমাতে কার্যকর? যে কেউ কি এটা ব্যবহার করতে পারবেন বা সবার জন্যই কি তা নিরাপদ? এ প্রসঙ্গে রাজধানীর গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

ওজন কমানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সাপ্তাহিক ওষুধগুলো মূলত জিএলপি-১ (গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড-১) অ্যাগোনিস্ট গ্রুপের ওষুধ
ছবি: এআই

ওজন কমানোর সূত্রটা খুব সহজ। আপনি সারা দিনে যতটা ক্যালরি গ্রহণ করবেন, তার চেয়ে বেশি খরচ করবেন। সাদামাটাভাবে বলা যায়, কেউ ওজন কমাতে চাইলে ক্যালরি কম গ্রহণ করবেন আর যত বেশি খরচ করবেন ততই ভালো। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সপ্তাহে আধা কেজি–এক কেজির বেশি ওজন কমানোও আবার উচিত নয়।

ওজন কমানোর এই সূত্র মেনে চলার জন্যই বিভিন্ন ধরনের ডায়েট পরিকল্পনা করা হয়। কায়িক শ্রম বাড়াতে বলা হয়, ব্যায়াম বা ওয়ার্ক আউট করতে বলা হয়, যাতে ক্যালরি খরচ হয়।

তবে ক্যালরি গ্রহণ অতিরিক্ত কমিয়ে ফেলার মতো বাড়াবাড়ি করলেও শরীরের ক্ষতি হয়। শরীরের ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যায়াম করতে গেলেও বিপদে পড়তে হয়। পুরোটাই একটা ব্যালেন্সের মধ্যে আনতে হবে। আর ওজন কমাতে তাড়াহুড়া করলে চলবে না। নিয়মিত ওপরের নিয়মকানুন মেনে চললে ধীরে ধীরে ওজন কমতে শুরু করবে।

ওজন কমানোর সাপ্তাহিক ওষুধ কীভাবে কাজ করে

ওজন কমানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সাপ্তাহিক ওষুধগুলো মূলত জিএলপি-১ (গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড-১) অ্যাগোনিস্ট গ্রুপের ওষুধ। জিএলপি বা গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড একধরনের হরমোন, যা খাবার গ্রহণের পর আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রে নিঃসৃত হয়।

এটি ইনসুলিনকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, তাই রক্তের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এটি আমাদের হজমপ্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এ কারণে মস্তিষ্কে সংকেত যায়—পেট ভরাই আছে, অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রয়োজন নেই। ফলে খাবার গ্রহণের ইচ্ছা অনেকটা কমে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু খেতে আর ইচ্ছা করে না।

ওজন কমাতে চাইলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই
ছবি: কবির হোসেন

খাবার কম খাওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই ক্যালরি গ্রহণ কম হবে। ফলে ওজন কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে কেবল ওষুধ নিলেই যে ওজন কমে যাবে, তা নয়।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। বরং যাঁরা ওজন কমানোর ইনজেকশন নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য এখন বিশেষ খাদ্যতালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ওজন হ্রাসের সঙ্গে যাতে পেশিক্ষয় না হয়, সে জন্য আমিষ খেতে বলা হচ্ছে বেশি। দুর্বলতা কাটানোর জন্য প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি।

আর পেশিক্ষয় প্রতিরোধ করার আরেক উপায় হলো রেজিট্যান্স এক্সারসাইজ। যাঁরা ওষুধের পাশাপাশি একই সঙ্গে এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারবেন, তাঁদের সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকিও কম।

আরও পড়ুন

কারা নেবেন

জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট ওজন কমাতে দারুণ কার্যকর একটি ওষুধ। তবে যে কেউ ইচ্ছা করলেই যে এ ধরনের ওষুধ গ্রহণ করবেন, বিষয়টা এমন নয়। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অনেক কিছু বিবেচনা করে এ ধরনের ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দেন। যেমন—

  • যাঁদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০ বা তার বেশি।

  • যাঁদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ২৫ বা তার বেশি, কিন্তু সেই সঙ্গে স্থূলতাজনিত কোনো জটিলতা আছে (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, ফ্যাটি লিভার, স্লিপ অ্যাপনিয়া, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ইত্যাদি)।

আরও পড়ুন

তবে কিছু শারীরিক সমস্যা থাকলে এ ধরনের ওষুধ গ্রহণ করতে বিধিনিষেধ আছে। যেমন—

  • যাঁদের অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হয়েছিল বা ঝুঁকি আছে

  • যাঁদের পাকস্থলীর গতিশীলতা এমনিতেই কম (গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস)

  • অনিয়ন্ত্রিত ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ

  • থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস

  • কিছু হরমোনসংশ্লিষ্ট টিউমার থাকলেও এসব ওষুধ গ্রহণ করতে নেই

  • এ ছাড়া এ ধরনের ওষুধে অ্যালার্জি হলে এবং গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে এড়িয়ে চলতে হবে

কিছু শারীরিক সমস্যা থাকলে ওজন কমানোর এ ধরনের ওষুধ গ্রহণ করতে বিধিনিষেধ আছে
ছবি: ফ্রিপিক

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী

  • বমিভাব, বমি, বুক জ্বালাপোড়া, পেটে অস্বস্তি, পাতলা পায়খানা কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে ওষুধ সেবনের পর।

  • কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যার মাত্রা অনেক বেশি হলে বমি কিংবা পাতলা পায়খানার কারণে পানিশূন্যতা হতে পারে।

  • খাবারের স্বাদ বদলে গেছে বলে মনে হতে পারে। দেখা দিতে পারে ক্ষুধামান্দ্য।

  • খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখতে না পারলে পুষ্টির ঘাটতিও হতে পারে। মাথাব্যথা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি হতে পারে পুষ্টিহীনতা ও ডিহাইড্রেশনের কারণে।

  • অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হতে পারে।

  • পেশির ক্ষয়ও হতে পারে। বিশেষত বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি গুরুতর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এসব ওষুধের সঙ্গে যদি এমন কোনো ওষুধ সেবন করা হয়, যা দেহে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ায়, তাহলে রক্তের সুগার স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যেতে পারে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া)। ইনসুলিন গ্রহণকারীকে ইনসুলিনের ডোজ কমাতে হতে পারে একই কারণে।

আরও পড়ুন

খেয়াল রাখুন

  • এই গ্রুপের প্রায় সব ওষুধ (সিমেগ্লুটাইড, লিরাগ্লুটাইড ও টারজেপেটাইড) বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এসবই যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদিত। তবে কোনটি কার জন্য উপযোগী, কত ডোজে নিতে হবে, কত দিন নিতে হবে—এসব বিষয় কেবল একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই বলতে পারবেন।

  • সপ্তাহে একটি ইনজেকশন নাকি মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট, কোনটা আপনার জন্য ভালো, সেটিও তিনি ঠিক করে দেবেন।

  • ওষুধ গ্রহণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কেও তাঁর কাছ থেকেই জেনে নেবেন।

  • এ ধরনের ওষুধ গ্রহণের সময় খাদ্যাভ্যাস কী হবে, সেটাও জেনে নিতে হবে। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া যায়।

  • একটি ওষুধের ডিভাইস বা পেন একাধিক ব্যক্তির মধ্যে ভাগাভাগি করা উচিত নয়। এমনকি সুই বদলে নিলেও নয়।

  • এসব অনেকটা ইনসুলিনের মতোই পেপটাইড–জাতীয় হরমোন, তাই ২ থেকে ৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা ভালো। রেফ্রিজারেটরের শেলফে রাখতে হবে, ডিপ ফ্রিজ বা দরজায় নয়। তবে ঘরের তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইনজেকশন ভেদে ২১ থেকে ৫৬ দিন পর্যন্ত রাখা যাবে।

অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং স্তন্যদানকারী নারীর জন্য ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়
মডেল: আভিয়ান ও হৃদি। ছবি: প্রথম আলো
  • অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং স্তন্যদানকারী নারীর জন্য এসব ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।

  • কোনো কোনো ওষুধ সর্বনিম্ন ১৫ বছর এবং কোনোটি ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ। ছোটদের ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

  • কিডনির রোগীরাও একটি বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত নিরাপদে ব্যবহার করতে পারবেন, এর কোনো কোনোটি কিডনি বিকল রোগীদের জন্যও নিরাপদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

  • এ ধরনের ওষুধ কত দিন ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেক সময় যথেষ্ট ওজন কমার পর ওষুধ বন্ধ করে দিলে আবার ওজন বাড়তে শুরু করে। তাই ওজন হ্রাসের পর মাত্রা কমিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন