হঠাৎ বেশি মাংস খেলে যাঁদের সমস্যা হবে

ঈদ আয়োজনে সব বাড়িতেই কমবেশি মাংসের কিছু পদ থাকে। অধিকাংশ মানুষই দারুণ পছন্দ করেন এসব পদ। কেউ কেউ আবার একটু বেশি উৎসাহী হয়ে বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলেন সুস্বাদু এসব পদ। দীর্ঘদিন ধরে লাল মাংস খাওয়া হলে যে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, এ বিষয়ে অনেকেই জানেন। তবে হঠাৎ মাংস খেলেও কি কোনো সমস্যা হতে পারে? স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন এবং টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ও পুষ্টিবিদ শম্পা শারমিন খান-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

মাংস খাওয়ার পর কারও কারও কিছু শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারেমডেল: তোড়া বিশ্বাস। ছবি: কবির হোসেন

মাংস এমন খাবার, যা হজম হতে একটু বেশি সময় লাগে। বিশেষত বেশি তেল আর মসলা দিয়ে রান্না করা হলে কিংবা মাংসে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে তো কথাই নেই। এ ধরনের খাবারের হজম ও বিপাকপ্রক্রিয়া যখন আমাদের দেহে চলে, তখন দেহে তাপ উৎপন্ন হয়। তাই যেকোনো গুরুপাক খাবার খাওয়ার পর হুট করে একটু গরম লেগে উঠতেই পারে, এমনকি শরীর ঘেমে ওঠাও বিচিত্র নয়।

আর যদিও খাবার থেকে আমরা শক্তি পাই, তবু এ ধরনের খাবার খাওয়ার পরপরই শরীর ছেড়ে দেওয়ার মতো একটা অনুভূতি হতে পারে। বেশি পরিমাণ মাংস খাওয়ার পর শরীরটা বেশ ভারী অনুভব করতে পারেন। আলসেমিও চলে আসতে পারে কিছু সময়ের জন্য।

এ ছাড়া উচ্চ মাত্রায় লবণ, তেল আর মসলা দিয়ে রান্না করা যেকোনো পদ কিংবা চর্বিযুক্ত যেকোনো পদ খাওয়ার পর গলা শুকিয়ে আসতেই পারে। বেশ অনেকটা সময় পর্যন্ত বাড়তি পানি খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। মাংসের নানা পদ এভাবে রান্না হয়। তাই এসব পদ খাওয়ার পর অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগতে পারে।

এসব বিষয় আদতে তেমন কোনো সমস্যা নয়। তবে কিছু শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে মাংস খাওয়ার পর। কারও কারও মাংস খাওয়ার ব্যাপারে কিছুটা বিধিনিষেধও থাকে।

হতে পারে অ্যালার্জি

মাংস কিংবা মাংসের পদে থাকা কোনো উপকরণে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। রোস্টে থাকা টক দই কিংবা বিরিয়ানিতে থাকা দুধের কারণে এমনটা হতে পারে। হালিমের বহু উপকরণের কোনোটিতে অ্যালার্জি হলেও এ রকম হতে পারে।

অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হলে চুলকানি হতে পারে, ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে, চাকাজাতীয় ক্ষতও সৃষ্টি হতে পারে ত্বকে। ঠোঁট, মুখ ও শরীর ফুলে যেতে পারে। পেটব্যথা, বমি কিংবা পাতলা পায়খানা হতে পারে। মারাত্মক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টও হতে পারে।

অ্যালার্জি নেই, তবু…

দুধ বা দুধের তৈরি খাবার হজমেও কারও কারও সমস্যা থাকে। এ ধরনের খাবার খেলে পেটব্যথা, বমি বা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে তাঁদেরও। দুধে থাকা ল্যাকটোজ হজম করার জন্য যে এনজাইম প্রয়োজন, দেহে সেই এনজাইমের ঘাটতি থাকলে এমনটা হয়ে থাকে।

এ সমস্যাকে বলা হয় ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স। যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে, মাংসের পদে দুধ বা দইয়ের মতো উপকরণ ব্যবহার করা হলে সেই পদ খাওয়ার পর তাঁদের এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন

পেটের আরও যত সমস্যা

ভারি খাবার খেতে হবে নিজের শরীর বুঝে
ছবি: কবির হোসেন

দুষ্পাচ্য খাবার খাওয়ার পর বদহজম হয় অনেকেরই। বারবার ঢেকুর ওঠে, কারও কারও পায়ুপথে অতিরিক্ত গ্যাস বেরোয়। ঢেকুর ওঠার সময় মুখে বেশ অস্বস্তিকর একটা টক স্বাদ চলে আসতে পারে। বিশেষ করে কারও যদি অ্যাসিডিটির প্রবণতা বেশি থাকে, তাঁর এ ধরনের সমস্যার ঝুঁকি বেশি।

মাংস ঠিকভাবে হজম না হলে বমি বা পাতলা পায়খানা হতে পারে। ক্ষুধামান্দ্যও দেখা দিতে পারে। আর অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে হাঁসফাঁস তো লাগবেই। মাংসের পদ খেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে, যদি খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশসমৃদ্ধ খাবার না থাকে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তাঁরা গরুর মাংস খেলে সমস্যাটি আরও বাড়তে পারে।

মাংস সঠিকভাবে সেদ্ধ করা না হলে কিংবা বাসি মাংস খেলে এর মাধ্যমে জীবাণুও ছড়াতে পারে। পেটব্যথা, বমি বা পাতলা পায়খানা হতে পারে এ কারণে। বিশেষ করে কাবাবজাতীয় পদগুলো তৈরি করার সময় পুরোপুরি সেদ্ধ করা হয় না। এ ধরনের পদ খেয়ে অনেকেই অসুস্থতায় ভোগেন।

মাংসে যাঁদের বিধিনিষেধ আছে

মাংসে যাঁদের অ্যালার্জি আছে, তাঁদের মাংস এড়িয়ে যাওয়া উচিত। এর বাইরেও কারও কারও মাংস খাওয়ায় বিধিনিষেধ থাকে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাঁদের লাল মাংস খাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা প্রয়োজন। চর্বির অংশ ফেলে মাংস ছোট টুকরা করে রান্না করা উচিত। মাথা, মগজ, মজ্জা, পায়া, কলিজা প্রভৃতি অংশ, যাতে চর্বির মাত্রা বেশি, এড়িয়ে চলতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি রোজ কতটা আমিষ খেতে পারবেন, সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলা আবশ্যক। মাংস ও কলিজা খেলে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও বাড়ে। তাই যাঁদের ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে, তাঁদেরও মাংস খেতে হবে পরিমিত। অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হলে সেই সময়ে মাংস এড়িয়ে চলতে বলা হয়।

আরও পড়ুন

সবার জন্য প্রযোজ্য

মাংসের সঙ্গে যেকোনো সালাদ খেলে হজম সমস্যার ঝুঁকি কমে
মডেল: তোড়া বিশ্বাস। ছবি: কবির হোসেন

আপনার যদি কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যা না-ও থাকে, তবে কি আপনি ইচ্ছেমতো মাংস খাবেন? একদমই না। যেকোনো খাবারই অতিরিক্ত গ্রহণ করাটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সুস্থ থাকতে সবারই নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা প্রয়োজন।

  • উৎসবেও সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন। উদ্ভিজ্জ খাবার গ্রহণ করুন বেশি। মাংস খান পরিমিত। মাংসের সঙ্গেও কিছু উদ্ভিজ্জ উপকরণ যোগ করে নিতে পারেন। এভাবে খাবারের স্বাদ ও গুণগত মান দুটোই বাড়বে। মাংসের সঙ্গে যেকোনো সালাদ খেলে হজম সমস্যার ঝুঁকি কমে, আর অনেকটা আঁশও পাওয়া যায়।

  • মাংস খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করুন। মাংসের আধসেদ্ধ ধরনের পদ এড়িয়ে চলাই ভালো।

  • যেকোনো পদ তৈরি ও পরিবেশনের সময় হাত পরিষ্কার রাখুন। হাতের নখ ছোট রাখাই ভালো।

  • প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলুন।

  • কেউ কেউ ফার্মের মুরগি চামড়াসহ রান্না করেন। এটা ঠিক নয়। মাংসের চামড়া ফেলে রান্না করাই ভালো।

  • মাংস বা যেকোনো খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি খেতে নেই। অন্তত ১৫-২০ মিনিট পর পানি বা পানীয় গ্রহণ করুন। খাবারের আগে পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সময়ের এই ব্যবধান মেনে চলুন। খাবার ও পানি একসঙ্গে খেলে হজমের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

আরও পড়ুন