গরমে পানিশূন্যতা নিয়ে কেন এত ভয়
পানির ঘাটতি হলেই বিপদ। চৈত্র-বৈশাখের তাপপ্রবাহ পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। আবার তেষ্টা মেটাতে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর পানীয় খেয়ে ডায়রিয়া বা বমি হলেও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। পানিশূন্যতা বিষয়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মতলেবুর রহমান এবং স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মেডিসিন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম
দেহকোষের অন্যতম উপাদান পানি। কোষের গঠন, গড়ন এবং কাজ ঠিকঠাক রাখতে চাই পানি। তাই রোজ পর্যাপ্ত পানি খেতে হবে।
পানিশূন্যতা এবং অতিরিক্ত পানি গ্রহণ—কোনোটাই দেহের জন্য ভালো নয়। পানিশূন্যতাজনিত কিছু সমস্যার কথা জেনে নেওয়া যাক। সঙ্গে জেনে নিন প্রতিরোধের উপায়ও।
‘টুকটাক’ সমস্যা
পানিশূন্যতার প্রভাবে ছোটখাটো কিছু সমস্যা দেখা দেয়, যা আমরা সহজেই এড়িয়ে যাই। এসব সমস্যার অন্যতম হলো মাথাব্যথা। কারণ না জেনেই অনেকে ওষুধ খেয়ে নেন। তাতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মূল কারণটা ধরতে না পারায় মাথাব্যথাও রয়েই যায়।
পানির ঘাটতি হলে মুখ ও গলা শুকিয়ে যায়। শুকনা লাগে ঠোঁট। পিপাসা লাগে। মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও হতে পারে।
পানিশূন্যতার প্রভাবে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হয়। আর সহজেই অধৈর্য হয়ে পড়ি। তুচ্ছ কারণে মেজাজ বিগড়ে যায়।
সমস্যাগুলোকে ছোট মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। আর সাধারণ সমস্যার আড়ালে দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে লম্বা সময় ধরে। ফলে অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
মূত্রতন্ত্রের নানা রোগ
দেহের বর্জ্য বের করতে রোজ পর্যাপ্ত প্রস্রাব হতেই হবে। কিন্তু পানিশূন্যতার মারাত্মক প্রভাব পড়ে কিডনিতে। কমে যায় কিডনির স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়। প্রস্রাব হয় গাঢ় রঙের। দেহে জমা হতে থাকে ক্ষতিকর বর্জ্য। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে প্রস্রাব একেবারে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
তা ছাড়া পানিশূন্যতার কারণে প্রস্রাবে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে নারীদের এই ঝুঁকি বেশি। তা ছাড়া পানিশূন্যতার কারণে যে কারোরই মূত্রতন্ত্রে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইলেকট্রোলাইটের তারতম্য, হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা
দেহে পানির ভারসাম্য নষ্ট হলে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। দেহকোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য এই ভারসাম্য বজায় থাকা জরুরি। এগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেও আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। এমনকি ইলেকট্রোলাইটের তারতম্য আমাদের মস্তিষ্ক কিংবা হৃৎপিণ্ডের মারাত্মক সমস্যার কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পানিশূন্যতার সরাসরি প্রভাব হৃদ্যন্ত্রের ওপরও পড়ে। দেহে পানির পরিমাণ অনেকটা কমে গেলে রক্তের জলীয় অংশের পরিমাণও কমে যায়। তাতে রক্তচাপ কমে যায়। রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তি পড়ে যেতে পারেন। তখন দেহের সব জায়গায় সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন করার জন্য হৃদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। ফলে হৃদ্যন্ত্রের গতি বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় এভাবে অতিরিক্ত কাজ করতে হলে হৃদ্যন্ত্রও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে।
পরিপাকতন্ত্র ও মস্তিষ্কে গন্ডগোল
পরিপাকতন্ত্রের কাজের জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। পানির অভাবে হজমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকিও অনেক বাড়ে। এসব কারণে পেটে অস্বস্তি হয়। ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। শারীরিক এই অস্বস্তির কারণেও গরমের সময় আমাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়।
পানিশূন্যতা মারাত্মক আকার ধারণ করলে মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব পড়ে। একজন মানুষ হঠাৎ এলোমেলো কথা বলতে শুরু করতে পারেন। হারিয়ে ফেলতে পারেন বিবেচনাবোধ। এমনকি অজ্ঞানও হয়ে পড়তে পারেন।
পানিশূন্যতা থেকে বাঁচার উপায়
পানিশূন্যতা থেকে বাঁচার উপায় সবারই জানা। পানিতেই মিটবে পানির চাহিদা। তবে আপনি কি পিপাসা লাগা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, তারপর পানি খাবেন? না। বরং পানি খাওয়াটাকে রোজকার জীবনের একটা অংশ করে ফেলুন। গরমের সময় সব বয়সীদেরই পানি খাওয়ার পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
সারা দিনে বিভিন্ন সময় পানি খাবেন। নানান রকম পানীয় খেতে পারেন। যেমন ডাবের পানি দারুণ এক পানীয়। তবে সব পানীয়ই আবার দেহের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ভালো নয়। চা-কফির পরিমাণ কম রাখুন। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
পানির পরিমাণ বেশি স্ন্যাক হিসেবে এমন ফল খান। পানির পরিমাণ বেশি, এমন সবজি খাদ্যতালিকায় রাখুন। যেসব সবজির ভেতরটা সাদা, সেগুলোতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে।
খাবার টেবিলে ঝোল ঝোল পদ বেছে নিন গরমের সময়টায়। খেতে পারেন পাতলা ডাল।
বাইরে যাওয়ার সময় সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ, গরম আবহাওয়ায় এসব বোতলে রাখা পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে যানবাহনের ভেতর পানির বোতল সহজেই গরম হয়ে যায়। তার চেয়ে বরং থার্মোফ্লাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। তাতে পানি ঠান্ডা ও নিরাপদ থাকে।
পানি হোক জীবাণুমুক্ত
পানি ও পানীয় তো খাবেনই। তবে তা যেন হয় নিরাপদ। যে পানীয়ই খাবেন, তা যেন ফোটানো বা ফিল্টার করা পানি দিয়ে তৈরি হয়। পানি ফোটানোর নিয়মটাও জানা জরুরি। পানি ফুটে ওঠামাত্রই নামিয়ে ফেলতে নেই। বরং পানি ফুটে ওঠার পর চুলার ওই তাপেই আরও ২০ মিনিট রাখতে হবে।
পানীর পাত্রও পরিষ্কার রাখুন। নইলে সেখানে জীবাণু জন্মাতে পারে। ফলের রস করবেন? পরিষ্কার হাতে কাজটা করুন। কাটাকুটির সরঞ্জামও রাখুন পরিষ্কার।
খেয়াল রাখুন
একবারে অনেকটা পানি না খেয়ে বারবার অল্প পরিমাণে পানি খাওয়া ভালো।
পর্যাপ্ত পানি খাচ্ছেন কি না, প্রস্রাবের রং ও পরিমাণ থেকেই তা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। প্রস্রাব করার সময় রং খেয়াল করুন। স্বাভাবিক প্রস্রাবের রং হালকা খড়ের মতো হয়। গাঢ় রঙের প্রস্রাব হওয়া কিংবা পরিমাণ কমে যাওয়া পানিশূন্যতার লক্ষণ। সাদা প্রস্রাব হওয়া এবং অনেক বেশি পরিমাণ প্রস্রাব হওয়ার অর্থ হলো আপনি বেশি পানি খাচ্ছেন।
অতিরিক্ত ঘাম হলে ওরস্যালাইন, ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক বা সামান্য লবণ মেশানো পানীয় খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত ঘাম হলে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিক রোগীও প্রয়োজন অনুসারে এ ধরনের পানীয় খেতে পারবেন।
দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচণ্ড গরমে কতটা পানি খাবেন, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।