রমজান মাসে সঠিকভাবে সিয়াম সাধনা ও ইবাদত পালনের জন্য শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, ঘুমের সময়ের পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচর্চায় গভীর পরিবর্তন আসে। এর একটা প্রতিক্রিয়া শারীরিক ছন্দে পড়ে। যাঁরা সুস্থ ও সবল, তাঁরা সহজেই এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন; কিন্তু যাঁদের ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
রমজানের দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেওয়া হলে কোনো বড় ধরনের জটিলতা ছাড়াই রোজা পালন সম্ভব। এরপরও কিছু রুটিন পরীক্ষা–নিরীক্ষা এই প্রস্তুতির অংশ।
কেন পরীক্ষা করবেন?
অনেকেরই অজান্তে ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকতে পারে। তাই আগে থেকেই নিজের শারীরিক অবস্থা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
রমজানের প্রস্তুতিতে রুটিন পরীক্ষা
আপনার কোনো বড় অসুখ না থাকলেও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিচের পরীক্ষাগুলো করে নিতে পারেন:
রক্তের শর্করা: খালি পেটে এবং তিন মাসের গড়।
সিবিসি: হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ও শরীরে কোনো সংক্রমণ আছে কি না, তা বুঝতে।
লিপিড প্রোফাইল: রক্তে ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা পরীক্ষার জন্য।
কিডনি ও লিভার টেস্ট: ক্রিয়েটিনিন (কিডনি) এবং এসজিপিটি (লিভার)।
থাইরয়েড: থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ক্লান্তি বা দুর্বলতা বেশি হতে পারে।
ভিটামিন ডি ও বি১২: এই দুই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে হাড় ও পেশিতে ব্যথা বা অবসাদ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য সতর্কতা
যাঁদের ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির রোগ বা ক্রনিক লিভার ডিজিজ আছে, তাঁরা অবশ্যই অন্তত তিন সপ্তাহ আগে রুটিন পরীক্ষা–নিরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। ডায়াবেটিক রোগীর রক্তে শর্করার গড়, ক্রিয়েটিনিন, লিপিড প্রোফাইল, প্রস্রাবের আমিষ পরীক্ষা করা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা শর্করা বেশি কমে যাওয়ার প্রবণতা—দুটিই রমজানে ঝুঁকিপূর্ণ। সে অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ও সময়সূচির নির্দেশনা দেবেন। কিডনির রোগীদের জন্য রোজা পালন একটু ঝুঁকিপূর্ণ।
ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা, জিএফআর, রক্তে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য, ইউরিক অ্যাসিড, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে রোজা করতে পারবেন কি না। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের রক্তচাপ মেপে ওষুধের সমন্বয় করতে হবে। হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে হার্ট ফেইলিউর বা অ্যারিদমিয়া ধরনের সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা করা যাবে না। এ ধরনের রোগীর রমজানে পানি পানের পরিমাণ ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সঠিক পরামর্শ নিতে হবে। থাইরয়েডের রোগীরাও অন্তত দুই সপ্তাহ আগে টেস্ট করিয়ে ওষুধ সমন্বয় করে নেবেন।
প্রত্যেক ব্যক্তির, বিশেষ করে ৪০ বছর বয়স হলে বছরে এক বা দুবার রুটিন টেস্ট করা উচিত।
রমজানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা চেকলিস্ট
১. ডায়াবেটিস ও শর্করা পরীক্ষা:
খালি পেটে রক্তের শর্করা
তিন মাসের গড় শর্করা
২. কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা:
সিরাম ক্রিয়েটিনিন—কিডনির অবস্থা বুঝতে।
এসজিপিটি/এএলটি—লিভারের অবস্থা বুঝতে।
৩. হৃদ্রোগ ও চর্বি পরীক্ষা:
লিপিড প্রোফাইল—কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকর চর্বি দেখতে।
৪. সাধারণ শারীরিক অবস্থা:
সিবিসি—হিমোগ্লোবিন ও রক্তাল্পতা আছে কি না, দেখতে।
টিএসএইচ—থাইরয়েড হরমোনের পরীক্ষা।
৫. ভিটামিন ও পুষ্টি (ঐচ্ছিক কিন্তু প্রয়োজনীয়):
ভিটামিন ডি
ভিটামিন বি১২
ডা. তানজিনা হোসেন: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ